ইরান–ইসরায়েল সংঘাত বাড়লে ভারতের কী হবে? জ্বালানি, অর্থনীতি ও কূটনীতিতে বড় ঝুঁকি
ইরান ও ইসরায়েলের সংঘাতের প্রভাব পড়তে পারে ভারতের জ্বালানি বাজারে, অর্থনীতি ও কূটনৈতিক ভারসাম্যে।
মধুরিমা সেনগুপ্ত, কলকাতা: মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে বহু বছর ধরেই উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ইরান এবং ইসরায়েল। এই দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের শত্রুতা বর্তমান সময়ে আরও তীব্র হয়েছে এবং পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছেছে যেখানে সরাসরি সামরিক সংঘর্ষের আশঙ্কা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এই সংঘাত যদি দীর্ঘস্থায়ী হয় বা বড় আকারের যুদ্ধে রূপ নেয়, তাহলে তার প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না,বরং বিশ্ব রাজনীতি, অর্থনীতি এবং জ্বালানি বাজারে তার বড় প্রতিক্রিয়া দেখা যেতে পারে। স্বাভাবিকভাবেই এর প্রভাব পড়তে পারে ভারতের মতো একটি বড় আমদানি-নির্ভর অর্থনীতির ওপরও।
ভারতের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো জ্বালানি নিরাপত্তা। ভারত তার মোট অপরিশোধিত তেলের প্রায় ৮৫ শতাংশ বিদেশ থেকে আমদানি করে এবং সেই আমদানির একটি বড় অংশ আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। একদিকে এই সংঘর্ষের ফলে এক ধাক্কায় অনেকটা বেড়েছে ঘরোয়া ও বাণিজ্যিক গ্যাসের দাম ! এছাড়াও এই যুদ্ধ পরিস্থিতির জন্য ইতিমধ্যেই প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক তেল বাজারে। বিশেষ করে পারস্য উপসাগরের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ স্ট্রেইট অফ হরমুজ দিয়ে বিশ্বের উল্লেখযোগ্য অংশের তেল পরিবহন হয়। যদি এই অঞ্চলে সামরিক উত্তেজনা বেড়ে যায় বা পরিবহন ব্যবস্থা ব্যাহত হয়, তাহলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যেতে পারে। তেলের দাম বৃদ্ধি পেলে তার সরাসরি প্রভাব পড়বে ভারতের অর্থনীতিতে, কারণ জ্বালানি খরচ বাড়লে পরিবহন ব্যয় বাড়ে, শিল্প উৎপাদনের খরচ বেড়ে যায় এবং শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ব্যয়ও বেড়ে যায়।
জ্বালানি বাজারের পাশাপাশি এই সংঘাত ভারতের সামগ্রিক অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে। তেলের দাম বেড়ে গেলে আমদানি ব্যয় বেড়ে যায় এবং এর ফলে দেশের বাণিজ্য ঘাটতি বাড়ার সম্ভাবনা থাকে। একই সঙ্গে মুদ্রাস্ফীতির চাপ বাড়তে পারে, কারণ জ্বালানি পণ্যের দাম বাড়লে খাদ্যদ্রব্য থেকে শুরু করে প্রায় সব পণ্যের দামেই তার প্রভাব পড়ে। এর ফলে অর্থনৈতিক উন্নতির গতি কিছুটা ধীর হয়ে যেতে পারে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও তার প্রভাব পড়তে পারে, কারণ বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীরা সাধারণত এই রকম সংঘাতপূর্ণ অবস্থায় ঝুঁকি নিতে চায় না।
এই সংঘাতের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো কূটনৈতিক ভারসাম্য। ভারতের সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্ক গত কয়েক দশকে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ হয়েছে, বিশেষ করে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, প্রযুক্তি এবং কৃষি উন্নয়নের ক্ষেত্রে। অন্যদিকে ইরানের সঙ্গেও ভারতের দীর্ঘদিনের কৌশলগত সম্পর্ক রয়েছে, বিশেষ করে জ্বালানি ও আঞ্চলিক যোগাযোগ ব্যবস্থার ক্ষেত্রে। আফগানিস্তান এবং মধ্য এশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্যিক যোগাযোগের জন্য ইরানে অবস্থিত চাবাহার বন্দর ভারতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রকল্প। ফলে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে সরাসরি যুদ্ধ শুরু হলে ভারতের জন্য কূটনৈতিকভাবে ভারসাম্য বজায় রাখা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে বসবাসকারী ভারতীয়দের নিরাপত্তার বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই অঞ্চলের বিভিন্ন দেশে লক্ষ লক্ষ ভারতীয় কর্মরত আছেন এবং তাদের একটি বড় অংশ তেল ও নির্মাণ শিল্পের সঙ্গে যুক্ত। যদি যুদ্ধের পরিস্থিতি মধ্যপ্রাচ্যের বিস্তৃত অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে সেখানে কর্মরত ভারতীয়দের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হতে পারে। অতীতে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংঘাতের সময় ভারত সরকারকে উদ্ধার অভিযান চালিয়ে বহু নাগরিককে দেশে ফিরিয়ে আনতে হয়েছে, তাই পরিস্থিতি গুরুতর হলে আবারও সেই ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আঞ্চলিক অস্থিরতার সম্ভাবনা। ইরান ও ইসরায়েলের সংঘাত যদি সরাসরি যুদ্ধের পর্যায়ে পৌঁছে যায়, তাহলে তা দ্রুত বড় আঞ্চলিক সংঘাতে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন শক্তি এবং আন্তর্জাতিক শক্তিগুলো এই সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে পারে, যার ফলে পুরো অঞ্চলের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বিপর্যস্ত হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে বৈশ্বিক বাণিজ্য, জ্বালানি পরিবহন এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দিতে পারে, যা ভারতের মতো উন্নয়নশীল অর্থনীতির জন্য উদ্বেগের কারণ।
সব মিলিয়ে বলা যায়, ইরান ও ইসরায়েলের চলমান উত্তেজনা বা সম্ভাব্য যুদ্ধ ভারতের জন্য শুধু একটি আন্তর্জাতিক খবর নয়, বরং তা দেশের অর্থনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা, কূটনৈতিক সম্পর্ক এবং প্রবাসী ভারতীয়দের নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। যদিও ভারত দীর্ঘদিন ধরে বহুমুখী কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রেখে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একটি ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান ধরে রাখার চেষ্টা করেছে, তবুও মধ্যপ্রাচ্যে বড় ধরনের সংঘাত শুরু হলে তার প্রভাব পুরোপুরি এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। তাই এই পরিস্থিতি ভারতের নীতিনির্ধারকদের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত চ্যালেঞ্জ হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।