বাংলার কাঁধে ৮ লক্ষ কোটির ঋণ! প্রতিশ্রুতির চাপে কি আরও সঙ্কটে বাংলার অর্থনীতি?
অর্থ দপ্তরের সম্ভাব্য হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষে রাজ্যের মোট ঋণের পরিমাণ ৮.১৫ লক্ষ কোটি টাকায় পৌঁছতে পারে। অর্থনীতিবিদদের মতে, কোনও রাজ্যের ঋণ সাধারণত তার GSDP- র ২০-২৫ শতাংশের মধ্যে থাকলে সেটাকে নিরাপদ ধরা হয়। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে সেই হার ইতিমধ্যেই প্রায় ৩৮ শতাংশ। অর্থাৎ রাজ্যের আয়ের তুলনায় ঋণের বোঝা অনেকটাই বেশি।
মধুরিমা সেনগুপ্ত, কলকাতা : পশ্চিমবঙ্গে সরকার বদলেছে, কিন্তু সবচেয়ে বড় প্রশ্নটা এখন রাজ্যের অর্থনীতি নিয়ে। শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন নতুন বিজেপি সরকার নির্বাচনের আগে একাধিক বড় প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল— মহিলাদের ভাতা বাড়ানো, বেকার ভাতা দ্বিগুণ করা, সরকারি কর্মীদের বকেয়া ডিএ মেটানো। কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়ন করতে গেলে রাজ্যের কোষাগারের ওপর কতটা চাপ পড়বে, তা নিয়েই এখন শুরু হয়েছে বড় আলোচনা। কারণ পশ্চিমবঙ্গ ইতিমধ্যেই দেশের অন্যতম ঋণগ্রস্ত রাজ্য।
অর্থ দপ্তরের সম্ভাব্য হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষে রাজ্যের মোট ঋণের পরিমাণ ৮.১৫ লক্ষ কোটি টাকায় পৌঁছতে পারে। অর্থনীতিবিদদের মতে, কোনও রাজ্যের ঋণ সাধারণত তার GSDP- র ২০-২৫ শতাংশের মধ্যে থাকলে সেটাকে নিরাপদ ধরা হয়। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে সেই হার ইতিমধ্যেই প্রায় ৩৮ শতাংশ। অর্থাৎ রাজ্যের আয়ের তুলনায় ঋণের বোঝা অনেকটাই বেশি। তার ওপর প্রতি বছর সুদ শোধ করতেই সরকারের বিপুল টাকা খরচ হয়ে যাচ্ছে।
সবচেয়ে বড় আর্থিক চাপ আসতে পারে সামাজিক প্রকল্পগুলোর খরচ থেকে। আগের সরকারের ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’ প্রকল্পে বছরে প্রায় ৩৯ হাজার কোটি টাকা খরচ হতো। বিজেপি প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, ক্ষমতায় এলে সেই ভাতা বাড়িয়ে মাসে ৩ হাজার টাকা করা হবে। তাহলে শুধুমাত্র এই প্রকল্পের পেছনেই বছরে প্রায় ৭৯ হাজার কোটি টাকা খরচ হতে পারে।
একইভাবে বেকার ভাতা দ্বিগুণ করার প্রতিশ্রুতিও সরকারের ওপর নতুন চাপ তৈরি করবে। আগে যেখানে বছরে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা খরচ হতো, এখন তা বেড়ে ৩০ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছতে পারে। এর পাশাপাশি রয়েছে ডিএ ইস্যু। রাজ্যের সরকারি কর্মচারীদের কেন্দ্রীয় হারের সমান ডিএ দিতে গেলে বছরে অতিরিক্ত প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা লাগতে পারে। আবার বকেয়া ডিএ মেটাতে এককালীন আরও কয়েক হাজার কোটি টাকার চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ফলে অর্থনীতিবিদদের একাংশের আশঙ্কা, নতুন সরকারের প্রতিশ্রুতিগুলো পুরোপুরি কার্যকর হলে রাজ্যের রাজস্ব ঘাটতি আরও বেড়ে যেতে পারে। তখন সরকারকে নতুন করে ঋণ নিতে হবে, আর সেই ঋণের সুদ ভবিষ্যতে আরও বড় বোঝা হয়ে দাঁড়াবে।
তবে সরকার পক্ষের দাবি, ‘ডাবল ইঞ্জিন’ সরকার হওয়ার সুবিধায় কেন্দ্র থেকে বেশি আর্থিক সহায়তা আসবে। ‘আয়ুষ্মান ভারত’-এর মতো কেন্দ্রীয় প্রকল্প চালু হলে স্বাস্থ্য খাতে রাজ্যের খরচ কমবে বলেও দাবি করা হচ্ছে। পাশাপাশি কর আদায় বাড়ানো, অপচয় কমানো এবং নতুন বিনিয়োগ আনার কথাও বলছে সরকার।
কিন্তু বাস্তব প্রশ্নটা এখনও একই— বিপুল ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে কি সত্যিই এত বড় প্রতিশ্রুতি পালন করা সম্ভব? সাধারণ মানুষ এখন শুধু রাজনৈতিক পরিবর্তন নয়, অর্থনৈতিক স্বস্তিও চাইছেন। তাই নতুন সরকার বাংলার অর্থনীতিকে কতটা সামলাতে পারে, সেটাই আগামী দিনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হতে চলেছে।