ল্যাপটপ খুলতেই জমির নথি! ১০০ কোটির সম্পত্তির অভিযোগ! দেবরাজ- অদিতি মুন্সিকে ঘিরে তদন্তে নতুন মোড়
কলকাতা হাই কোর্টে রাজ্যের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, গত পাঁচ বছরে অদিতি মুন্সির ঘোষিত আয় প্রায় ৪০ লক্ষ টাকা এবং দেবরাজ চক্রবর্তীর প্রায় ৬৭ লক্ষ টাকা। অথচ তাঁদের নামে বা তাঁদের সঙ্গে যুক্ত সম্পদের পরিমাণ প্রায় ১০০ কোটি টাকা বলে তদন্তে উঠে এসেছে বলে রাজ্যের দাবি। একই সঙ্গে আদালতে জানানো হয়, তাঁদের ব্যবহৃত তিনটি গাড়ির মূল্যই প্রায় ৭১ লক্ষ টাকা।
মধুরিমা সেনগুপ্ত, কলকাতা: একের পর এক দুর্নীতির মামলায় যখন পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি উত্তাল, তখন নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়িকা অদিতি মুন্সি এবং তাঁর স্বামী, বিধাননগর পুরসভার প্রাক্তন কাউন্সিলর দেবরাজ চক্রবর্তীর নাম। কলকাতা হাই কোর্টে আগাম জামিনের আবেদন খারিজ হওয়ার পর দেবরাজ চক্রবর্তীকে গ্রেফতার করেছে তদন্তকারী সংস্থা। তদন্তে উদ্ধার হওয়া একটি ল্যাপটপ, সম্পত্তি হস্তান্তরের নথি এবং আয়ের তুলনায় বিপুল সম্পত্তির অভিযোগ ঘিরে মামলাটি এখন আরও গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
তদন্তকারীদের দাবি, দেবরাজ চক্রবর্তীর কাছ থেকে উদ্ধার হওয়া ল্যাপটপে একাধিক জমি কেনাবেচা এবং সম্পত্তি হস্তান্তরের গুরুত্বপূর্ণ নথি মিলেছে। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এই নথিগুলির মধ্যে এমন কিছু সম্পত্তির কাগজ রয়েছে, যেগুলি বিভিন্ন ব্যক্তি বা সংস্থার নামে কেনা বা হস্তান্তর করা হয়েছে বলে তদন্তকারীদের সন্দেহ। তদন্তে "ডিসি গ্লোবাল" নামে একটি সংস্থার সঙ্গে যুক্ত নথিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এই সংস্থার মাধ্যমে সম্পত্তি লেনদেন বা হস্তান্তর হয়েছে কি না, সেই বিষয়টিও তদন্তের আওতায় রয়েছে। তবে এই অভিযোগগুলির সত্যতা এখনও বিচারাধীন এবং তদন্ত চলছে।
এই মামলার অন্যতম বড় অভিযোগ হল আয়ের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ বিপুল সম্পত্তি অর্জন। কলকাতা হাই কোর্টে রাজ্যের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, গত পাঁচ বছরে অদিতি মুন্সির ঘোষিত আয় প্রায় ৪০ লক্ষ টাকা এবং দেবরাজ চক্রবর্তীর প্রায় ৬৭ লক্ষ টাকা। অথচ তাঁদের নামে বা তাঁদের সঙ্গে যুক্ত সম্পদের পরিমাণ প্রায় ১০০ কোটি টাকা বলে তদন্তে উঠে এসেছে বলে রাজ্যের দাবি। একই সঙ্গে আদালতে জানানো হয়, তাঁদের ব্যবহৃত তিনটি গাড়ির মূল্যই প্রায় ৭১ লক্ষ টাকা। এই বিপুল সম্পদের উৎস নিয়েই তদন্তকারীরা প্রশ্ন তুলেছেন।
রাজ্যের আইনজীবীরা আদালতে আরও অভিযোগ করেন, ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের ঠিক আগে বিপুল পরিমাণ সম্পত্তি আত্মীয়স্বজন ও পরিচিতদের নামে হস্তান্তর করা হয়। তদন্তকারীদের সন্দেহ, নির্বাচনী হলফনামায় সম্পত্তির প্রকৃত পরিমাণ কম দেখানোর উদ্দেশ্যেই এই হস্তান্তর করা হয়ে থাকতে পারে। আদালতে এই বিষয়েও বিস্তারিত তদন্তের নির্দেশ চাওয়া হয়। যদিও অদিতি মুন্সি ও দেবরাজ চক্রবর্তীর আইনজীবীর বক্তব্য ছিল, সম্পত্তি হস্তান্তর নিজে কোনও অপরাধ নয় এবং নির্বাচনী হলফনামায় ভুল তথ্য থাকলেও তা নির্বাচন-সংক্রান্ত বিষয়, ফৌজদারি অপরাধ নয়। আদালতও জানিয়েছে, অভিযোগগুলির তদন্ত চলবে এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়ার উপর নির্ভর করবে।
তদন্তে আরও অভিযোগ উঠেছে, বিধাননগর ও সংলগ্ন এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে প্রভাব খাটিয়ে জমি দখল, তোলাবাজি, সিন্ডিকেট পরিচালনা এবং সেই সূত্রে বিপুল সম্পত্তি তৈরির অভিযোগ রয়েছে দেবরাজ চক্রবর্তীর বিরুদ্ধে। এই অভিযোগগুলিও তদন্তাধীন এবং এখনও আদালতে প্রমাণিত হয়নি। তদন্তকারীরা বিভিন্ন ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট, সম্পত্তির নথি, আর্থিক লেনদেন এবং ডিজিটাল ডিভাইস পরীক্ষা করে সম্পদের উৎস খুঁজে দেখছেন।
অন্যদিকে, অদিতি মুন্সি শিশুসন্তানের কথা বিবেচনা করে অন্তর্বর্তীকালীন আইনি সুরক্ষা পেলেও তাঁকেও তদন্তে পূর্ণ সহযোগিতার নির্দেশ দিয়েছে কলকাতা হাই কোর্ট। দেবরাজ চক্রবর্তীর ক্ষেত্রে সেই সুরক্ষা না থাকায় তাঁকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এখন তদন্তের পরবর্তী ধাপে উদ্ধার হওয়া ল্যাপটপ, সম্পত্তি সংক্রান্ত নথি এবং আর্থিক লেনদেনের তথ্য কতটা শক্ত প্রমাণ হিসেবে উঠে আসে, তার দিকেই নজর রাজনৈতিক মহল থেকে তদন্তকারী সংস্থা—সবার। মামলাটির তদন্ত এখনও চলছে এবং অভিযোগগুলির বিচারিক নিষ্পত্তি হওয়া বাকি।