চাকরি বিক্রির ‘সুপারভাইজার’ কে? মদন মিত্রকে ঘিরে ইডির তল্লাশি

পুরনিয়োগ দুর্নীতি মামলায় মদন মিত্রের একাধিক ঠিকানায় ইডির তল্লাশি। ১২৫টির বেশি বেআইনি নিয়োগ, নগদ ও সোনার ঘুষ এবং মধ্যস্থতাকারীদের ভূমিকা নিয়ে কী অভিযোগ উঠেছে, জানুন বিস্তারিত।

চাকরি বিক্রির ‘সুপারভাইজার’ কে? মদন মিত্রকে ঘিরে ইডির তল্লাশি

মধুরিমা সেনগুপ্ত, কলকাতা : পশ্চিমবঙ্গের বহুচর্চিত পুরনিয়োগ দুর্নীতি মামলায় এবার তদন্তের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এলেন কামারহাটির তৃণমূল বিধায়ক মদন মিত্র। শনিবার সকাল থেকে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি) কলকাতা ও শহরতলির একাধিক জায়গায় একযোগে তল্লাশি চালায়। তদন্তকারীদের একটি দল পৌঁছে যায় মদন মিত্রের ভবানীপুর, কালীঘাট, কামারহাটি-সহ একাধিক ঠিকানায়। এই অভিযানের মূল উদ্দেশ্য ছিল পুরসভাগুলিতে বেআইনি নিয়োগের অভিযোগে তাঁর সম্ভাব্য ভূমিকা খতিয়ে দেখা।

ইডি সূত্রে দাবি, কামারহাটি-সহ রাজ্যের একাধিক পুরসভায় অযোগ্য প্রার্থীদের চাকরি পাইয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রভাব খাটানো হয়েছিল। তদন্তকারীদের সন্দেহ, এই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাব ব্যবহার করে চাকরি দেওয়া হয়েছে এবং তার বিনিময়ে নগদ অর্থ ও সোনার মাধ্যমে ঘুষ লেনদেন হয়েছে। তদন্তে উঠে আসা তথ্য অনুযায়ী, ১২৫টিরও বেশি সন্দেহজনক নিয়োগের সঙ্গে মদন মিত্রের নাম জড়িয়ে থাকতে পারে বলে তদন্তকারীরা খতিয়ে দেখছেন। তবে এই অভিযোগ এখনও আদালতে প্রমাণিত হয়নি।

তদন্তকারীদের ধারণা, ঘুষের টাকা বা সোনা সরাসরি মদন মিত্রের হাতে পৌঁছত না। একাধিক মধ্যস্থতাকারী বা ‘মিডলম্যান’-এর মাধ্যমে সেই লেনদেন সম্পন্ন হতো। ফলে ইডি শুধু মদন মিত্র নন, সম্ভাব্য এজেন্ট ও যোগাযোগের শৃঙ্খলও খতিয়ে দেখছে। এই কারণেই একাধিক জায়গায় একসঙ্গে তল্লাশি চালানো হয়েছে এবং বিভিন্ন নথি, ডিজিটাল ডিভাইস ও ব্যাঙ্ক সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে।

এই মামলার সূত্রপাত হয়েছিল স্কুল নিয়োগ দুর্নীতির তদন্ত থেকে। সেই তদন্তে গ্রেফতার হওয়া ব্যবসায়ী অয়ন শীলের দফতর থেকে উদ্ধার হওয়া ওএমআর শিট, নথি এবং ডিজিটাল তথ্য বিশ্লেষণ করতে গিয়েই পুরসভায় চাকরি বিক্রির সম্ভাব্য চক্রের সন্ধান পান তদন্তকারীরা। সেখান থেকেই উঠে আসে মদন মিত্রের নাম। অভিযোগ, যোগ্য প্রার্থীদের বঞ্চিত করে টাকার বিনিময়ে বহু অযোগ্য ব্যক্তিকে বিভিন্ন পুরসভায় চাকরি দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে সেই সূত্র ধরেই পুরনিয়োগ দুর্নীতি মামলার তদন্ত আরও বিস্তৃত হয়।

ইডির বর্তমান তদন্তে বিশেষভাবে কামারহাটি পুরসভার ভূমিকা গুরুত্ব পাচ্ছে। কারণ দীর্ঘদিন ধরে ওই এলাকার বিধায়ক হিসেবে মদন মিত্রের রাজনৈতিক প্রভাব রয়েছে। তদন্তকারীরা খতিয়ে দেখতে চাইছেন, সেই প্রভাব ব্যবহার করে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় কোনও অনিয়ম ঘটানো হয়েছিল কি না। পাশাপাশি উত্তর ও দক্ষিণ দমদম, পানিহাটি, বরাহনগর, হালিশহর-সহ একাধিক পুরসভাকেও তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে।

শনিবারের অভিযানে বিভিন্ন ঠিকানা থেকে ব্যাঙ্ক নথি, আর্থিক লেনদেন সংক্রান্ত তথ্য এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র সংগ্রহের কথা জানা গেছে। তদন্তকারীরা আর্থিক প্রবাহ, নিয়োগের সুপারিশ এবং মধ্যস্থতাকারীদের ভূমিকার মধ্যে কোনও যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা খুঁজে দেখছেন। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদও করা হচ্ছে।

উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, এই তল্লাশি এমন এক সময়ে হয়েছে যখন কামারহাটি পুরসভা নিয়ে রাজনৈতিক উত্তেজনা তুঙ্গে। পুরসভার প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে প্রকাশ্যে সরব হয়েছিলেন মদন মিত্র। তার ঠিক পরদিনই ইডির এই অভিযান রাজ্যের রাজনৈতিক মহলে নতুন করে চর্চার বিষয় হয়ে উঠেছে।

এখন তদন্তের পরবর্তী ধাপের দিকে নজর রয়েছে। ইডি যে নথি ও তথ্য সংগ্রহ করেছে, সেগুলি বিশ্লেষণ করেই ঠিক হবে অভিযোগগুলির সত্যতা এবং এই নিয়োগ-চক্রে কারা কারা জড়িত ছিলেন। তবে আপাতত এটুকু স্পষ্ট যে, পুরনিয়োগ দুর্নীতি মামলায় তদন্তের পরিধি আরও বিস্তৃত হয়েছে এবং সেই তদন্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছেন মদন মিত্র।