"রাতের অন্ধকারে, মাথায় চাদর ঢাকা দিয়ে বিজেপির সাথে যোগাযোগ করতে যেতেন" ২১ এর মঞ্চ থেকে বিষ্ফোরক মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়

বাংলায় বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াই করতে বিরোধী দলগুলিকে একসঙ্গে থাকার আহ্বান জানান তিনি। একইসঙ্গে দল ছেড়ে যাঁরা বেরিয়ে গিয়েছেন, তাঁদের নিয়েও কড়া অবস্থান স্পষ্ট করেন তৃণমূলনেত্রী। বিদ্রোহীদের উদ্দেশে তাঁর বার্তা ছিল, আরও অনেকে দল ছেড়ে গেলে তিনি খুশিই হবেন—অর্থাৎ দল ছেড়ে যাওয়া নেতাদের ফেরানোর ক্ষেত্রে আপাতত নরম মনোভাব দেখানোর কোনও ইঙ্গিত দেননি তিনি।

"রাতের অন্ধকারে, মাথায় চাদর ঢাকা দিয়ে বিজেপির সাথে যোগাযোগ করতে যেতেন" ২১ এর মঞ্চ থেকে বিষ্ফোরক মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়

মধুরিমা সেনগুপ্ত, কলকাতা: একুশে জুলাই এবার শুধু শহিদ দিবসের স্মরণ নয়, বাংলার রাজনীতিতে শক্তি প্রদর্শনেরও মঞ্চ। তৃণমূলের ভাঙনের পর একই দিনে কলকাতার কেন্দ্রস্থলে একাধিক কর্মসূচি ঘিরে তৈরি হয়েছে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ। একদিকে বিড়লা তারামণ্ডলের সামনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে তৃণমূলের সমাবেশ, অন্যদিকে মেয়ো রোডে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন বিদ্রোহী তৃণমূল শিবিরের পাল্টা কর্মসূচি। এছাড়াও শহীদ মিনারে কংগ্রেসের একুশে জুলাইয়ের কর্মসূচি, ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে—একুশের ‘দখল’ শেষ পর্যন্ত কার হাতে? 

এবারের একুশে জুলাই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে আরও তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ঐতিহ্য ভেঙে এবার এসপ্ল্যানেডের বদলে বিড়লা তারামণ্ডলের সামনে সভা করতে হয়েছে। কলকাতা হাই কোর্টের নির্দেশে স্থান পরিবর্তনের পাশাপাশি জমায়েতের ক্ষেত্রেও বিধিনিষেধ ছিল। সেই পরিস্থিতিতে মঞ্চ থেকে মমতা মূলত দলীয় কর্মী-সমর্থকদের ঐক্যবদ্ধ থাকার বার্তা দেন এবং বিজেপির বিরুদ্ধে বৃহত্তর বিরোধী ঐক্যের ডাক দেন।

মমতার বক্তব্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল ইন্ডিয়া জোটের প্রসঙ্গ। বাংলায় বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াই করতে বিরোধী দলগুলিকে একসঙ্গে থাকার আহ্বান জানান তিনি। একইসঙ্গে দল ছেড়ে যাঁরা বেরিয়ে গিয়েছেন, তাঁদের নিয়েও কড়া অবস্থান স্পষ্ট করেন তৃণমূলনেত্রী। বিদ্রোহীদের উদ্দেশে তাঁর বার্তা ছিল, আরও অনেকে দল ছেড়ে গেলে তিনি খুশিই হবেন—অর্থাৎ দল ছেড়ে যাওয়া নেতাদের ফেরানোর ক্ষেত্রে আপাতত নরম মনোভাব দেখানোর কোনও ইঙ্গিত দেননি তিনি। বরং যাঁরা তৃণমূলের সঙ্গে নেই, তাঁদের বিজেপিতে যোগ দেওয়ার চ্যালেঞ্জও ছুড়ে দেন। 

একুশের মঞ্চে মমতা আরও অভিযোগ করেন, তাঁর সমাবেশ বানচাল করার চেষ্টা হয়েছে। তাঁর দাবি, বিজেপি-ঘনিষ্ঠ দুষ্কৃতীরা সভার মঞ্চ ও পরিকাঠামোয় ভাঙচুর করেছে এবং তারের সংযোগ কেটে দেওয়ার চেষ্টা করেছে। এই অভিযোগকে কেন্দ্র করে সকাল থেকেই রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়। 

এবার আসা যাক ভিড়ের প্রশ্নে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সমাবেশে আদালতের নির্ধারিত সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও বিপুল সংখ্যক দলীয় কর্মী-সমর্থকের উপস্থিতি দেখা গিয়েছে বলে একাধিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। অন্যদিকে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন পাল্টা সমাবেশেও জমায়েত হয়েছে। তবে এখনও পর্যন্ত যে ছবি ও প্রতিবেদন সামনে এসেছে, তাতে দৃশ্যমান জনসমাগম এবং রাজনৈতিক উপস্থিতির বিচারে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিড়লা তারামণ্ডল-কেন্দ্রিক সমাবেশই তুলনামূলকভাবে বড় বলে মনে হচ্ছে। তবে দুই সমাবেশের ভিড়ের নির্ভুল সংখ্যা নিয়ে কোনও নিরপেক্ষ সরকারি হিসাব এখনও প্রকাশিত হয়নি। তাই নির্দিষ্ট সংখ্যা দাবি করা এই মুহূর্তে ঠিক হবে না। 

সব মিলিয়ে, ২০২৬-এর একুশে জুলাই বাংলার রাজনীতিতে নতুন এক অধ্যায়ের ইঙ্গিত দিল। একই দিনে একই রাজনৈতিক ঐতিহ্যকে সামনে রেখে একাধিক শিবিরের কর্মসূচি দেখিয়ে দিল, তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ সংঘাত এখন আর শুধু দলের অন্দরে সীমাবদ্ধ নেই। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মঞ্চ থেকে একদিকে বিজেপির বিরুদ্ধে বৃহত্তর বিরোধী ঐক্যের ডাক, অন্যদিকে দলত্যাগী ও বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে কঠোর বার্তা—দুইয়ের মিশ্রণেই তৈরি হল এবারের একুশের রাজনৈতিক সুর। আর ভিড়ের বিচারে এখনও পর্যন্ত এগিয়ে মমতার শিবিরই, যদিও ঋতব্রতদের পাল্টা সমাবেশও রাজনৈতিকভাবে নজর কেড়েছে।