অবশেষে মিললো ২১ জুলাই পালনের অনুমতি, ধর্মতলা নয়, বিড়লা প্ল্যানেটোরিয়ামের সামনে কালীঘাট তৃণমূলের সমাবেশ

কলকাতা হাইকোর্টের নির্দেশে, ২১ জুলাইয়ের কর্মসূচির জন্য শর্তসাপেক্ষে অনুমতি পেল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল। তবে এবার আর ঐতিহ্যবাহী ধর্মতলার ভিক্টোরিয়া হাউসের সামনে নয়, সমাবেশ হবে বিড়লা প্ল্যানেটোরিয়ামের সামনে।

অবশেষে মিললো ২১ জুলাই পালনের অনুমতি, ধর্মতলা নয়, বিড়লা প্ল্যানেটোরিয়ামের সামনে কালীঘাট তৃণমূলের সমাবেশ

মধুরিমা সেনগুপ্ত, কলকাতা: ২১ জুলাইকে ঘিরে এ বছর শুধু রাজনৈতিক উত্তাপই ছিল না, ছিল পরিচয় ও উত্তরাধিকারের লড়াইও। প্রশ্ন উঠেছিল—১৯৯৩ সালের ২১ জুলাইয়ের আন্দোলনের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার কার? মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন কালীঘাট তৃণমূলের, নাকি দল থেকে বহিষ্কৃত হয়ে আলাদা তৃণমূল গড়া ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবিরের? অন্যদিকে ক্ষমতা হারানোর পর ধর্মতলায় ২১ জুলাইয়ের কর্মসূচির ওপরেও জারি হয়েছে নিষেধাজ্ঞা। সেই টানাপোড়েনের মধ্যেই বুধবার কলকাতা হাইকোর্টের নির্দেশে, ২১ জুলাইয়ের কর্মসূচির জন্য শর্তসাপেক্ষে অনুমতি পেল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল। তবে এবার আর ঐতিহ্যবাহী ধর্মতলার ভিক্টোরিয়া হাউসের সামনে নয়, সমাবেশ হবে বিড়লা প্ল্যানেটোরিয়ামের সামনে।

প্রতি বছরের মতো এ বছরও তৃণমূল তাদের শহিদ দিবসের সমাবেশ ধর্মতলায় করতে চেয়েছিল। কিন্তু কলকাতা পুলিশ জানায়, ওই এলাকায় ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার (BNSS) ১৬৩ ধারা বলবৎ থাকায় সেখানে কোনও রাজনৈতিক সভার অনুমতি দেওয়া সম্ভব নয়। একই কারণে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবিরের আবেদনও কার্যত আটকে যায়। এরপর কালীঘাট তৃণমূল কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয় এবং জানায়, ২১ জুলাইয়ের শহিদ দিবস তাদের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক কর্মসূচি, তাই অনুমতি না দেওয়া হলে সাংবিধানিক অধিকারে হস্তক্ষেপ হবে।

শুনানিতে বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্যের বেঞ্চ একদিকে প্রশাসনের আইনশৃঙ্খলার যুক্তি, অন্যদিকে রাজনৈতিক দলের গণতান্ত্রিক অধিকার—দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করে। আদালত শেষ পর্যন্ত সমাবেশের অনুমতি দিলেও স্থান পরিবর্তনের নির্দেশ দেয়। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, ২১ জুলাইয়ের সভা বিড়লা প্ল্যানেটোরিয়ামের সামনে হবে এবং আয়োজকদের একাধিক শর্ত কঠোরভাবে মানতে হবে। নির্দিষ্ট সময়সীমা মেনে কর্মসূচি শেষ করতে হবে, পুলিশের ট্রাফিক ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে হবে এবং সাধারণ মানুষের যাতায়াতে অযথা বিঘ্ন ঘটানো যাবে না। আদালত স্পষ্ট করে দিয়েছে, অনুমতির কোনও শর্ত লঙ্ঘিত হলে প্রশাসন আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে পারবে।

এই রায়ের রাজনৈতিক গুরুত্বও কম নয়। কারণ, এ বছর প্রথমবার ২১ জুলাইকে ঘিরে একই রাজনৈতিক ঐতিহ্যের দাবিদার দুই তৃণমূল শিবির মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়িয়েছিল। একদিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন কালীঘাট তৃণমূল, অন্যদিকে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে গঠিত নতুন তৃণমূল—দুই পক্ষই নিজেদের প্রকৃত উত্তরাধিকারী বলে দাবি করে আসছিল। সেই আবহে আদালতের অনুমতি কালীঘাট তৃণমূলের কর্মসূচিকে আইনি স্বীকৃতি দেওয়ায় রাজনৈতিক মহলে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

তবে আদালতের নির্দেশে আরেকটি বিষয়ও স্পষ্ট হয়েছে। গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার পাশাপাশি জনস্বার্থ, আইনশৃঙ্খলা এবং শহরের স্বাভাবিক ছন্দ বজায় রাখাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সেই কারণেই ঐতিহ্যবাহী ধর্মতলার বদলে বিকল্প স্থানে সমাবেশের অনুমতি দেওয়া হয়েছে এবং প্রশাসনিক শর্ত কঠোরভাবে বেঁধে দেওয়া হয়েছে। ফলে ২১ জুলাইয়ের রাজনৈতিক বার্তার পাশাপাশি নজর থাকবে আদালতের নির্দেশ কতটা মেনে কর্মসূচি পরিচালিত হয়, সেদিকেও।