"বাবা বলেছিল, আমি বেঁচে আছি..." তারপর নিস্তব্ধ ফোন! তারাতলার ধ্বংসস্তূপে হারিয়ে যাওয়া জীবনের গল্প

তারাতলা দুর্ঘটনা শুধু একটি নির্মাণ প্রকল্পের ব্যর্থতার প্রশ্ন নয়, বরং শ্রমিক নিরাপত্তা নিয়ে বৃহত্তর আলোচনারও জন্ম দিয়েছে। প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করা শ্রমিকদের জন্য পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল কি না, জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত উদ্ধার সম্ভব করার মতো ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল কি না—এসব প্রশ্ন এখন সামনে এসেছে।

"বাবা বলেছিল, আমি বেঁচে আছি..." তারপর নিস্তব্ধ ফোন! তারাতলার ধ্বংসস্তূপে হারিয়ে যাওয়া জীবনের গল্প

মধুরিমা সেনগুপ্ত, কলকাতা : কলকাতার তারাতলায় নির্মীয়মাণ একটি বিশাল গুদামঘর বা ওয়্যারহাউস ধসে পড়ার ঘটনায় গোটা রাজ্য স্তম্ভিত। বুধবার দুপুরে ঘটে যাওয়া এই দুর্ঘটনায় এখনও পর্যন্ত অন্তত ৯ জন শ্রমিকের মৃত্যুর খবর সামনে এসেছে। আহত হয়েছেন ২০ জনেরও বেশি শ্রমিক। ধ্বংসস্তূপের নিচে আরও মানুষ আটকে থাকার আশঙ্কায় রাতভর উদ্ধারকাজ চালানো হয়েছে। সেনাবাহিনী, এনডিআরএফ, এসডিআরএফ, দমকল, কলকাতা পুলিশ এবং দুর্যোগ মোকাবিলা বাহিনী যৌথভাবে উদ্ধার অভিযানে অংশ নেয়। 

প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৩২ হাজার বর্গফুটের এই নির্মীয়মাণ কাঠামোয় ঘটনাকালে কয়েক ডজন শ্রমিক কাজ করছিলেন। আচমকা ছাদ ও কাঠামোর একটি বড় অংশ ভেঙে পড়ে। মুহূর্তের মধ্যে শ্রমিকরা কংক্রিটের স্ল্যাব, লোহার বিম ও অন্যান্য নির্মাণসামগ্রীর নিচে চাপা পড়েন। দুর্ঘটনার পর চারদিকে চিৎকার, কান্না আর আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি হয়। 

এই ঘটনার সবচেয়ে হৃদয়বিদারক দিক হলো শ্রমিকদের পরিবারের অসহায় অপেক্ষা। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, নিখোঁজ শ্রমিক আজগর হোসেনের মেয়ে বারবার প্রশাসনের কাছে বাবাকে খুঁজে দেওয়ার আবেদন জানাচ্ছিলেন। তাঁর কথায়, দুর্ঘটনার পর একবার ফোনে বাবার সঙ্গে কথা হয়েছিল। তখন তিনি বলেছিলেন যে তিনি বেঁচে আছেন। তারপর হঠাৎ ফোন বন্ধ হয়ে যায়। সেই থেকে পরিবারের সদস্যরা হাসপাতাল, উদ্ধারকেন্দ্র এবং দুর্ঘটনাস্থলের মধ্যে ছুটে বেড়িয়েছেন প্রিয়জনের খোঁজে। একই ছবি দেখা গেছে আরও বহু পরিবারের ক্ষেত্রে। কেউ স্বজনকে উদ্ধার হওয়ার খবর পেয়ে স্বস্তি পেয়েছেন, আবার কেউ এখনও অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। 

দুর্ঘটনার পর থেকেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে নির্মাণের গুণমান এবং অনুমোদন প্রক্রিয়া নিয়ে। বিভিন্ন মহলে দাবি করা হচ্ছে, যদি নির্মাণকাজে প্রযুক্তিগত ত্রুটি বা নিরাপত্তা বিধি লঙ্ঘন হয়ে থাকে, তাহলে তার দায় এড়ানো যাবে না। কিছু প্রতিবেদনে সম্ভাব্য ডিজাইন ত্রুটির কথাও উঠে এসেছে। তবে এখনও পর্যন্ত কোনও সরকারি তদন্তে এই অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি। ফলে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ নিয়ে এখনই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়। 

রাজনৈতিক স্তরেও শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক। বিরোধীরা অভিযোগ তুলেছে যে দীর্ঘদিন ধরে নির্মাণ প্রকল্পগুলিতে নজরদারির অভাব, অনুমোদন প্রক্রিয়ার দুর্বলতা এবং সম্ভাব্য দুর্নীতির সংস্কৃতি এমন দুর্ঘটনার জন্য দায়ী হতে পারে। অন্যদিকে প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, পূর্ণাঙ্গ তদন্ত ছাড়া কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছানো উচিত নয়। এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো উদ্ধার অভিযান সম্পূর্ণ করা এবং দোষীদের চিহ্নিত করা।

ইতিমধ্যেই নির্মীয়মাণ গুদাম ধসের ঘটনায় গুদামের মালিক শম্ভুনাথ বেহরা-সহ মোট পাঁচ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তদন্তকারীরা নির্মাণ সংস্থা, প্রকল্পের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি, নকশা অনুমোদন এবং নিরাপত্তা মান রক্ষার বিষয়গুলি খতিয়ে দেখছেন। পাশাপাশি শহরের বিভিন্ন নির্মীয়মাণ প্রকল্পের নিরাপত্তা পরিস্থিতিও পুনরায় পরীক্ষা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে সেফটি অডিটের কথাও ঘোষণা করা হয়েছে। 

এই দুর্ঘটনা শুধু একটি নির্মাণ প্রকল্পের ব্যর্থতার প্রশ্ন নয়, বরং শ্রমিক নিরাপত্তা নিয়ে বৃহত্তর আলোচনারও জন্ম দিয়েছে। প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করা শ্রমিকদের জন্য পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল কি না, জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত উদ্ধার সম্ভব করার মতো ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল কি না—এসব প্রশ্ন এখন সামনে এসেছে। নিহত ও আহতদের পরিবারের কাছে রাজনৈতিক তরজা নয়, প্রকৃত দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা এবং ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা রোধের নিশ্চয়তাই সবচেয়ে বড় দাবি হয়ে উঠেছে।

তারাতলা দুর্ঘটনায় মৃতদের পরিবার এবং আহতদের জন্য আর্থিক সাহায্যের ঘোষণা করলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। বৃহস্পতিবার এক্স হ্যান্ডেলে এই দুর্ঘটনায় শোকপ্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী জানান, এই দুর্ঘটনা অত্যন্ত দুঃখজনক। প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন, দুর্ঘটনায় যাঁরা প্রাণ হারিয়েছেন, তাঁদের নিকটাত্মীয়দের ২ লক্ষ টাকা করে আর্থিক সাহায্য দেওয়া হবে।

তারাতলার এই বিপর্যয়ের তদন্ত এখনও চলছে। ফলে চূড়ান্ত দায় কার, তা নিয়ে নিশ্চিত মন্তব্য করার সময় এখনও আসেনি। তবে এত বড় প্রাণহানির ঘটনার পর নির্মাণ শিল্পে নিরাপত্তা ও জবাবদিহি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে, তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই।