পশ্চিমবঙ্গে UCC চালু হলে কী কী বদলাবে? বিয়ে, তালাক, সম্পত্তি—সহজ ভাষায় সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ঘোষণা করেছেন, রাজ্যে UCC কার্যকর করা হবে এবং এর জন্য আইনসভায় বিল আনার প্রক্রিয়া শুরু হবে। একইসঙ্গে তিনি জানিয়েছেন, জোর করে ধর্মান্তকরণের বিরুদ্ধে আলাদা কঠোর আইনও আনা হবে। তবে এখনও এই বিল আইন হিসেবে কার্যকর হয়নি। তাই কী কী বদল হতে পারে এবং সাধারণ মানুষের জীবনে তার প্রভাব কী হতে পারে, সেটাই সহজ ভাষায় জেনে নেওয়া যাক।
মধুরিমা সেনগুপ্ত, কলকাতা : বিয়ে, তালাক, উত্তরাধিকার—এবার কি সবার জন্য একই আইন? পশ্চিমবঙ্গে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি (Uniform Civil Code বা UCC) নিয়ে রাজনৈতিক চর্চা এখন তুঙ্গে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ঘোষণা করেছেন, রাজ্যে UCC কার্যকর করা হবে এবং এর জন্য আইনসভায় বিল আনার প্রক্রিয়া শুরু হবে। একইসঙ্গে তিনি জানিয়েছেন, জোর করে ধর্মান্তকরণের বিরুদ্ধে আলাদা কঠোর আইনও আনা হবে। তবে এখনও এই বিল আইন হিসেবে কার্যকর হয়নি। তাই কী কী বদল হতে পারে এবং সাধারণ মানুষের জীবনে তার প্রভাব কী হতে পারে, সেটাই সহজ ভাষায় জেনে নেওয়া যাক।
অভিন্ন দেওয়ানি বিধি বা UCC বলতে এমন একটি আইনকে বোঝায়, যেখানে ধর্মভেদে আলাদা ব্যক্তিগত আইন না থেকে বিয়ে, বিবাহবিচ্ছেদ, সন্তানের দত্তক গ্রহণ, ভরণপোষণ এবং সম্পত্তির উত্তরাধিকার—এসব বিষয়ে সকল নাগরিকের জন্য একই ধরনের নিয়ম প্রযোজ্য হবে। অর্থাৎ, হিন্দু, মুসলিম, খ্রিস্টান, শিখ বা অন্য যে কোনও ধর্মের মানুষই একই দেওয়ানি আইনের আওতায় আসবেন।
বর্তমানে ভারতে ব্যক্তিগত আইন ধর্মভেদে আলাদা। যেমন, বিয়ে বা উত্তরাধিকার সংক্রান্ত নিয়ম হিন্দু, মুসলিম বা খ্রিস্টানদের ক্ষেত্রে এক নয়। UCC চালু হলে এই আলাদা আইনগুলির পরিবর্তে একটি অভিন্ন আইন কার্যকর হতে পারে। তবে আইনটি ঠিক কীভাবে তৈরি হবে, তা নির্ভর করবে চূড়ান্ত বিলের উপর।
সাধারণ মানুষের জীবনে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হতে পারে বিয়ে ও বিবাহবিচ্ছেদের ক্ষেত্রে। সব ধর্মের মানুষের জন্য একই ধরনের আইনি প্রক্রিয়া এবং একই অধিকার কার্যকর হতে পারে। একইভাবে ভরণপোষণ, সন্তানের হেফাজত এবং দত্তক গ্রহণের ক্ষেত্রেও একক নিয়ম প্রযোজ্য হতে পারে। এতে আইনি জটিলতা কমবে বলে সরকারের দাবি।
উত্তরাধিকার এবং সম্পত্তি ভাগাভাগির ক্ষেত্রেও বড় পরিবর্তন আসতে পারে। বর্তমানে বিভিন্ন ধর্মের নিজস্ব উত্তরাধিকার আইন রয়েছে। UCC কার্যকর হলে ছেলে-মেয়ে, স্ত্রী বা স্বামীর সম্পত্তির অধিকার একই আইনের ভিত্তিতে নির্ধারিত হতে পারে। তবে এই বিষয়ে কী কী নির্দিষ্ট বিধান থাকবে, তা বিলের চূড়ান্ত খসড়া প্রকাশের পরই স্পষ্ট হবে।
বহুবিবাহের মতো বিষয়েও পরিবর্তন আসতে পারে। ইতিমধ্যেই উত্তরাখণ্ডের UCC-তে বহুবিবাহের অনুমতি নেই। পশ্চিমবঙ্গ সরকারও অন্য কয়েকটি রাজ্যের মডেল অনুসরণ করার কথা বলেছে। ফলে একই ধরনের বিধান এখানে আসতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। যদিও রাজ্যের প্রস্তাবিত আইনের চূড়ান্ত ভাষা এখনও প্রকাশ্যে আসেনি।
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী আরও জানিয়েছেন, UCC-র পাশাপাশি জোর করে ধর্মান্তকরণের বিরুদ্ধে কঠোর আইন আনা হবে। তাঁর দাবি, প্রতারণা, ভয় দেখানো বা লোভ দেখিয়ে ধর্ম পরিবর্তনের ঘটনা রুখতেই এই আইন আনা হবে। তবে স্বেচ্ছায় ধর্ম পরিবর্তনের বিষয়টি কীভাবে আইনে উল্লেখ করা হবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
তবে UCC নিয়ে বিতর্কও কম নয়। সমর্থকদের মতে, এতে সব নাগরিকের জন্য সমান আইন কার্যকর হবে এবং নারী-পুরুষের সমান অধিকার আরও শক্তিশালী হবে। অন্যদিকে বিরোধীদের দাবি, ভারতের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের কথা মাথায় রেখে ব্যক্তিগত আইন বজায় রাখা উচিত। তাই এই বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক ও আইনি বিতর্ক আগামী দিনেও চলতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, পশ্চিমবঙ্গে এখনও UCC কার্যকর হয়নি। সরকার বিল আনার ঘোষণা করেছে এবং আইনসভায় তা নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। বিল পাস হওয়া, প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হওয়া এবং সরকারিভাবে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পরই নতুন নিয়ম কার্যকর হবে। তাই এখনই কোনও পুরনো নিয়ম বদলে যায়নি।
আগামী কয়েকদিনে বিলের পূর্ণাঙ্গ খসড়া প্রকাশ হলে কোন নিয়ম ঠিক কীভাবে বদলাবে, কারা এর আওতায় আসবেন এবং কোনও ব্যতিক্রম রাখা হবে কি না—এসব বিষয়ে আরও স্পষ্ট ছবি সামনে আসবে। তাই সরকারি বিল এবং আইনসভায় গৃহীত চূড়ান্ত আইনের দিকেই নজর রাখা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।