তৃণমূলে ভাঙন? সত্যিই কি নতুন দল গঠনের পথে বিদ্রোহীরা?

আজ অর্থাৎ ৩রা জুন, বিধানসভায় প্রায় ৫৮ জন বিধায়কের সমর্থন স্বাক্ষরিত চিঠি বিদ্রোহী শিবির স্পিকারের কাছে জমা দিয়েছে।

তৃণমূলে ভাঙন? সত্যিই কি নতুন দল গঠনের পথে বিদ্রোহীরা?

মধুরিমা সেনগুপ্ত, কলকাতা : পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে গত কয়েক দিনে সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে তৃণমূল কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ সংকট। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ক্ষমতা হারানোর পর থেকেই দলের ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠছিল। কিন্তু এখন যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা শুধু মতবিরোধের পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নেই। রাজনৈতিক মহলের একাংশ মনে করছে, তৃণমূলের ভিতরে এমন একটি গোষ্ঠী তৈরি হয়েছে যারা ভবিষ্যতে আলাদা রাজনৈতিক শক্তি হিসেবেও আত্মপ্রকাশ করতে পারে।

বিতর্কের সূত্রপাত হয় বিধানসভায় বিরোধী দলনেতা নির্বাচনের বিষয়টি ঘিরে। তৃণমূল নেতৃত্ব শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতা হিসেবে মনোনীত করে। এরপর তৃণমূলের দুই বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় এবং সন্দীপন সাহা অভিযোগ তোলেন যে সমর্থনপত্রে তাঁদের স্বাক্ষর জাল করা হয়েছে। এই অভিযোগকে কেন্দ্র করেই দলের ভিতরে অসন্তোষ প্রকাশ্যে চলে আসে।

এই ঘটনার পর তৃণমূল দুই বিধায়ক, ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় এবং সন্দীপন সাহাকে দলবিরোধী কার্যকলাপের অভিযোগে বহিষ্কার করে। দলীয় নেতৃত্বের দাবি, তাঁরা দলের অনুমতি ছাড়া স্পিকারের কাছে অভিযোগ জানিয়েছেন এবং দলের স্বার্থবিরোধী কাজ করেছেন। 

কিন্তু ঘটনা সেখানেই থেমে থাকেনি। বহিষ্কৃত নেতাদের ঘিরে আরও বড় জল্পনা শুরু হয় যখন দাবি করা হয় যে তৃণমূলের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বিধায়ক তাঁদের অবস্থানের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। এবং আজ অর্থাৎ ৩রা জুন, বিধানসভায় প্রায় ৫৮ জন বিধায়কের সমর্থন স্বাক্ষরিত চিঠি বিদ্রোহী শিবির স্পিকারের কাছে জমা দিয়েছে। 

বিদ্রোহী তৃণমূল বিধায়কদের এই সমর্থনের ভিত্তিতে নতুন বিরোধী দলনেতা হতে পারেন ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় এবং মুখ্য সচেতক হতে পারেন মুর্শিদাবাদের বিধায়ক ও প্রাক্তন মন্ত্রী আখরুজ্জামান । 

তবে এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি। বিদ্রোহী শিবিরের দাবি এবং বাস্তব রাজনৈতিক অবস্থার মধ্যে এখনও পার্থক্য থাকতে পারে। বিষয়টি নিয়ে এখনও চূড়ান্ত সাংবিধানিক বা আইনি সিদ্ধান্ত হয়নি। তাই এই মুহূর্তে নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না যে তৃণমূল আনুষ্ঠানিকভাবে ভেঙে যাচ্ছে বা নতুন দল গঠন নিশ্চিত হয়ে গেছে। 

পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝেই তৃণমূল নেতৃত্ব বড় সাংগঠনিক পদক্ষেপ নিয়েছে। দল পশ্চিমবঙ্গের একাধিক কমিটি ও শাখা সংগঠন ভেঙে পুনর্গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এর মাধ্যমে দলীয় নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার এবং অসন্তোষ কমানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। 

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, বিদ্রোহী শিবির এখনও প্রকাশ্যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্ব পুরোপুরি অস্বীকার করেনি। বরং তাঁদের আপত্তির কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে দলের কিছু সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত এবং নেতৃত্ব নির্বাচন প্রক্রিয়াকে তুলে ধরা হয়েছে। ফলে বর্তমান পরিস্থিতিকে সরাসরি "নতুন দল গঠন" বলে ঘোষণা করা এখনও তাড়াহুড়ো হবে। 

তবুও এটা স্পষ্ট যে নির্বাচনে পরাজয়ের পর তৃণমূল কংগ্রেস তার ইতিহাসের অন্যতম কঠিন সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। আগামী কয়েক দিন স্পিকার, দলীয় নেতৃত্ব এবং বিদ্রোহী বিধায়কদের পদক্ষেপই ঠিক করবে এই সংকট সাময়িক মতবিরোধে সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে সত্যিই নতুন কোনও সমীকরণের জন্ম দেবে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে একটাই প্রশ্ন সবচেয়ে বেশি ঘুরে বেড়াচ্ছে—এটি কি শুধুই তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার লড়াই, নাকি পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা?