আবারও 'Work From Home'! কোনো অতিমারীর ইঙ্গিত?
আন্তর্জাতিক যুদ্ধ পরিস্থিতি, তেলের দাম বৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক চাপের মাঝেই দেশবাসীকে সংযম ও স্বদেশি পণ্য ব্যবহারের আহ্বান জানালেন নরেন্দ্র মোদি। এটা কি শুধুই সতর্কতা, নাকি বড় সংকটের পূর্বাভাস?
মধুরিমা সেনগুপ্ত, কলকাতা - সম্প্রতি নরেন্দ্র মোদী দেশের নাগরিকদের উদ্দেশ্যে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ আবেদন জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, আবার ওয়ার্ক ফ্রম হোম চালু করতে, পেট্রোল-ডিজেলের ব্যবহার কমাতে, অপ্রয়োজনীয় বিদেশ ভ্রমণ এড়িয়ে চলতে, স্বদেশি পণ্য ব্যবহার করতে, ভোজ্য তেলের ব্যবহার কমাতে, প্রাকৃতিক চাষের দিকে যেতে এবং কিছুদিন অপ্রয়োজনীয় সোনা কেনা বন্ধ রাখতে। এই বক্তব্য সামনে আসতেই অনেকের মনে প্রশ্ন উঠেছে—দেশ কি আবার কোনো বড় সংকটের দিকে এগোচ্ছে? করোনা মহামারীর মতো কোনো পরিস্থিতি কি ফিরে আসছে? নাকি এর পিছনে রয়েছে অন্য কোনো অর্থনৈতিক ও আন্তর্জাতিক বাস্তবতা?
প্রথমেই একটি বিষয় পরিষ্কার করে বলা দরকার, বর্তমানে এমন কোনো সরকারি ঘোষণা হয়নি যেখানে নতুন মহামারী বা লকডাউনের মতো পরিস্থিতির কথা বলা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী যে “ওয়ার্ক ফ্রম হোম”- এর কথা বলেছেন, তা মূলত করোনা নয়, বরং আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক চাপ এবং পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংঘাতের ফলে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়ছে, জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে এবং আমদানিনির্ভর দেশগুলির উপর চাপ বাড়ছে। ভারত বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেল আমদানিকারক দেশ হওয়ায় এই পরিস্থিতির প্রভাব ভারতের উপরও পড়ছে।
ভারত শুধু পেট্রোল-ডিজেল নয়, ভোজ্য তেল, সার, এমনকি সোনার ক্ষেত্রেও বিপুল পরিমাণে বিদেশি আমদানির উপর নির্ভরশীল। ফলে যখন আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ে, তখন দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডারের উপর চাপ পড়ে। প্রধানমন্ত্রী মূলত সেই চাপ কমানোর জন্যই নাগরিকদের সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
অনেকে প্রশ্ন তুলছেন, যদি পরিস্থিতি এতটাই উদ্বেগজনক না হয়, তাহলে হঠাৎ ওয়ার্ক ফ্রম হোম -এর কথা কেন? এর উত্তর অর্থনীতির মধ্যেই লুকিয়ে আছে। করোনা সময়কালে দেখা গিয়েছিল, লক্ষ লক্ষ মানুষ বাড়ি থেকে কাজ করায় শহরাঞ্চলে জ্বালানি খরচ অনেক কমেছিল। অফিস যাতায়াত কমলে পেট্রোল-ডিজেলের ব্যবহারও কমে। এখন যখন বিশ্বজুড়ে জ্বালানির দাম বাড়ছে, তখন সরকার চাইছে যে যেখানে সম্ভব সেখানে ডিজিটাল পদ্ধতি ব্যবহার করে অপ্রয়োজনীয় যাতায়াত কমানো হোক। এর মানে এই নয় যে আবার লকডাউন আসছে; বরং এটি এক ধরনের “প্রতিরোধমূলক অর্থনৈতিক প্রস্তুতি”।
বিদেশ ভ্রমণ কমানোর আবেদনও একই কারণেই। বিদেশে পর্যটন বা বিলাসী খরচের জন্য প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা বেরিয়ে যায়। একইভাবে ভারতে সোনার চাহিদা অত্যন্ত বেশি এবং সেই সোনার বড় অংশই আমদানি করতে হয়। ফলে যখন সরকার মানুষকে কিছুদিন অপ্রয়োজনীয় সোনা কেনা বন্ধ রাখতে বলছে, তখন তার মূল লক্ষ্য হচ্ছে বৈদেশিক মুদ্রা সঞ্চয় করা।
তবে এই বক্তব্যের আরেকটি রাজনৈতিক ও সামাজিক দিকও রয়েছে। “Swadeshi” বা “Vocal for Local” ধারণা বহুদিন ধরেই কেন্দ্রীয় সরকারের অর্থনৈতিক নীতির অংশ। স্থানীয় পণ্য কিনলে দেশীয় শিল্প, ছোট ব্যবসা, কৃষক এবং কর্মসংস্থান উপকৃত হয়—এই যুক্তি সরকার দীর্ঘদিন ধরেই দিয়ে আসছে। বর্তমান বৈশ্বিক অস্থিরতার মধ্যে সেই বার্তাকেই আরও জোরালো করা হয়েছে।
এখন প্রশ্ন হলো—এইভাবে কি সত্যিই সাধারণ মানুষ জীবনযাপন করতে পারবে?
বাস্তবতা হলো, সমাজের সব শ্রেণির মানুষের পক্ষে একইভাবে এই পরামর্শ মেনে চলা সম্ভব নয়। একজন IT কর্মী বা কর্পোরেট কর্মচারীর পক্ষে বাড়ি থেকে কাজ করা সহজ হতে পারে, কিন্তু একজন দিনমজুর, দোকানদার, পরিবহন কর্মী, ছোট ব্যবসায়ী বা কারখানার শ্রমিকের ক্ষেত্রে তা সম্ভব নয়। একইভাবে বিদেশ ভ্রমণ বা সোনা কেনা অনেকের জন্য বিলাসিতা হলেও, বহু মানুষের জীবিকা আবার এই শিল্পগুলির সঙ্গে যুক্ত। জুয়েলারি ব্যবসা, পর্যটন শিল্প, বিমান পরিষেবা, হোটেল ব্যবসা—সব ক্ষেত্রেই এর প্রভাব পড়তে পারে। সামাজিক মাধ্যমে এবং বিভিন্ন জনমতেও এই উদ্বেগ সামনে এসেছে।
আসলে প্রধানমন্ত্রী যে বার্তা দিয়েছেন, তা বাধ্যতামূলক নির্দেশ নয়; বরং এক ধরনের “জাতীয় সংযমের আহ্বান”। সরকার বোঝাতে চাইছে যে বিশ্ব পরিস্থিতি যদি আরও খারাপ হয়, তাহলে আগাম সতর্কতা দেশের অর্থনীতিকে কিছুটা সুরক্ষা দিতে পারে।
তবে এটাও সত্য যে শুধুমাত্র সাধারণ মানুষের সংযম দিয়ে বড় অর্থনৈতিক সংকট সামলানো যায় না। এর জন্য সরকারেরও শক্তিশালী নীতি, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, বিকল্প জ্বালানির উন্নয়ন, কৃষি ও শিল্পে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। সাধারণ মানুষ যদি দেখে যে শুধু তাদেরই ত্যাগ স্বীকার করতে বলা হচ্ছে কিন্তু মূল্যবৃদ্ধি, বেকারত্ব বা করের চাপ কমছে না, তাহলে অসন্তোষ বাড়তেই পারে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, বর্তমানে কোনো নতুন মহামারীর সরকারি ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি। বরং আন্তর্জাতিক যুদ্ধ পরিস্থিতি, তেলের মূল্যবৃদ্ধি, আমদানি ব্যয় এবং বৈদেশিক মুদ্রার উপর চাপ—এই সমস্ত কারণ মিলিয়েই প্রধানমন্ত্রী দেশের মানুষকে সতর্ক ও সংযমী হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। এটি একদিকে অর্থনৈতিক সতর্কবার্তা, অন্যদিকে আত্মনির্ভর ভারতের ধারণাকে আরও শক্তিশালী করার রাজনৈতিক বার্তাও বটে।