কেন দেরিতে অনুমতি দিল ইরান? হরমুজ প্রণালী নিয়ে কূটনৈতিক সমীকরণ
হরমুজ প্রণালী দিয়ে ভারতীয় তেলবাহী জাহাজ চলাচলের অনুমতি দিল ইরান। পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত ও কূটনৈতিক উত্তেজনার মাঝে এই সিদ্ধান্তে স্বস্তি ফিরছে ভারতের জ্বালানি বাজারে।
মধুরিমা সেনগুপ্ত, কলকাতা: পশ্চিম এশিয়ার উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যে অবশেষে ভারতের জন্য হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেলবাহী জাহাজ চলাচলের অনুমতি দিল ইরান। দীর্ঘ কয়েকদিনের অনিশ্চয়তার পর এই সিদ্ধান্তে স্বস্তি ফিরে এসেছে ভারতের জ্বালানি বাজারে। কারণ বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালী দিয়ে ভারতীয় জাহাজ চলাচল আটকে যাওয়ায় দেশের তেল ও গ্যাস সরবরাহে বড় চাপ তৈরি হয়েছিল।
গত কয়েকদিনে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে যে, হরমুজ প্রণালী কার্যত একটি কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ অঞ্চলে পরিণত হয়। এই প্রণালী দিয়ে বিশ্বের বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল প্রতিদিন পরিবাহিত হয়। ফলে এখানে সামান্য উত্তেজনাও বিশ্ব জ্বালানি বাজারকে নাড়িয়ে দেয়। সেই পরিস্থিতিতে ইরান নিরাপত্তার অজুহাতে অনেক দেশের জাহাজ চলাচলে কড়া নজরদারি শুরু করে।
এখানেই প্রশ্ন উঠেছে,ইরান কেন শুরুতেই ভারতকে হরমুজ প্রণালী ব্যবহারের অনুমতি দেয়নি? এর প্রধান কারণ ছিল সেই সময়ের সামরিক ও কূটনৈতিক সতর্কতা। পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে ইরান প্রথমে কেবলমাত্র কয়েকটি নির্দিষ্ট কৌশলগত মিত্র দেশকে ছাড় দিয়েছিল। সেই তালিকায় ছিল রাশিয়া এবং চীন। এই দুই দেশ ইরানের দীর্ঘদিনের কৌশলগত সহযোগী হওয়ায় তাদের জাহাজ চলাচল তুলনামূলকভাবে দ্রুত অনুমতি পেয়েছিল।
ভারতের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি একটু আলাদা ছিল। একদিকে ভারত ইরানের সঙ্গে ঐতিহাসিকভাবে ভালো সম্পর্ক বজায় রাখলেও অন্যদিকে ভারতের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে পশ্চিমা শক্তিগুলোর সঙ্গেও। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও পশ্চিম এশিয়ার সামরিক উত্তেজনার সময় ইরান অনেক ক্ষেত্রেই সতর্ক কূটনৈতিক অবস্থান নেয়। ফলে প্রথমে ভারতীয় জাহাজের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত যাচাই-বাছাই করা হয়েছিল।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল নিরাপত্তা। হরমুজ প্রণালীতে তখন সামরিক টহল, ড্রোন নজরদারি এবং সম্ভাব্য সংঘর্ষের ঝুঁকি বেড়ে গিয়েছিল। ইরান চাইছিল নিশ্চিত হতে যে কোনো জাহাজ যেন শত্রু দেশের গোয়েন্দা বা সামরিক কার্যকলাপের আড়াল না হয়। এই কারণে অনেক দেশের জাহাজকেই সাময়িকভাবে অপেক্ষা করতে হয়েছে।
অবশেষে কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়। ভারত স্পষ্টভাবে জানায় যে তাদের জাহাজ কেবল জ্বালানি পরিবহনের জন্যই চলাচল করছে এবং কোনো সামরিক উদ্দেশ্য নেই। এরপরই ইরান ভারতের জন্য প্রণালী ব্যবহারের অনুমতি দেয়।
এই সিদ্ধান্ত ভারতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দেশের জ্বালানি আমদানির একটি বড় অংশ মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসে এবং সেই তেল পরিবহনের প্রধান পথই হরমুজ প্রণালী। ইতিমধ্যেই কিছু রাজ্যে, বিশেষ করে শিল্পাঞ্চলে, গ্যাসের ঘাটতির প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। পশ্চিমবঙ্গেও ব্যবসায়িক গ্যাসের সংকটে পরিবহন ও ছোট শিল্পে চাপ তৈরি হয়েছে।
সব মিলিয়ে এই ঘটনায় স্পষ্ট হয়েছে যে বিশ্ব রাজনীতি ও আঞ্চলিক সংঘাত কীভাবে সরাসরি জ্বালানি সরবরাহ এবং সাধারণ অর্থনীতিকে প্রভাবিত করতে পারে। আপাতত পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেও বিশেষজ্ঞদের মতে,
ইসরাইল-ইরান সংঘাতের জন্য ভবিষ্যতেও ভারতের অর্থনৈতিক, সামাজিক অবস্থানের ক্ষতি হতে পারে।