"বিড়াল বেরোলো ঝুলি থেকে" - ৭৩ জন রিটার্নিং অফিসার বদলিতে নির্বাচন কমিশনকে তোপ মমতার
৭৩ জন রিটার্নিং অফিসার বদলির সিদ্ধান্তে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের। তিনি এই পদক্ষেপকে “অঘোষিত জরুরি অবস্থা” বলে দাবি করেছেন, যা ঘিরে উত্তপ্ত রাজ্য রাজনীতি।
মধুরিমা সেনগুপ্ত, কলকাতা: পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনকে ঘিরে এবারে নতুন করে বড় বিতর্ক তৈরি হয়েছে নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে। গতকাল মধ্যরাতে ৭৩ জন রিটার্নিং অফিসারকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে নির্বাচন কমিশন। এই তালিকায় রয়েছেন ভবানীপুর কেন্দ্রের রিটার্নিং অফিসারও—যেখান থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এই ঘটনাকে ঘিরে তিনি একাধিক কঠোর মন্তব্য করেছেন এবং সরাসরি নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
ঘটনা ঘটেছে গতকাল মধ্যরাতে, নির্বাচন কমিশন হঠাৎ করে একসঙ্গে ৭৩ জন রিটার্নিং অফিসারকে বদলি করে। এদের মধ্যে অধিকাংশই ছিলেন মহকুমাশাসক (SDO)। প্রশাসনিক মহলে এই সিদ্ধান্তকে “অভূতপূর্ব” বলা হচ্ছে, কারণ একসঙ্গে এত বড় সংখ্যায় রিটার্নিং অফিসার বদলি সাধারণত দেখা যায় না।
সম্প্রতি ভোটের ডেট ঘোষণা করার দিনকেই মধ্যরাতে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্য সচিব এবং স্বরাষ্ট্র সচিব বদলি করার পরেই, পশ্চিমবঙ্গের একাধিক পুলিশ আধিকারিককেও বদলি করেছেন নির্বাচন কমিশন। এবং নির্বাচন কমিশন থেকে জানানো হয়েছে যে তারা ভোটের কোন কাজেই অংশগ্রহণ করতে পারবে না। রাজ রাজনীতি উত্তপ্ত হয়ে আছে তখন থেকেই।
নির্বাচন কমিশনের তরফে বলা হয়েছে, এই বদলি করা হয়েছে "ফ্রি এন্ড ফেয়ার ইলেকশন" নিশ্চিত করার জন্য। কিন্তু এই যুক্তি মানতে নারাজ মুখ্যমন্ত্রী। তিনি সরাসরি অভিযোগ করেছেন, এই ধরনের পদক্ষেপ আসলে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্যে সবচেয়ে বেশি উঠে এসেছে “গণতন্ত্রের ওপর হস্তক্ষেপ”-এর অভিযোগ। তিনি বলেছেন, নির্বাচন কমিশন এমনভাবে রাজ্যের প্রশাসনে হস্তক্ষেপ করছে, যেন “ঘোষণা না করা রাষ্ট্রপতি শাসন” চলছে। তাঁর কথায়, এই পদক্ষেপ রাজ্যের স্বায়ত্তশাসনের উপর আঘাত আনছে। তাঁর অভিযোগ, ভোটের আগে প্রশাসনিক কাঠামো বদলে দিয়ে ভোট প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করার চেষ্টা চলছে।
এখানেই থেমে থাকেননি তিনি। একাধিক জনসভা ও রাজনৈতিক বক্তব্যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরাসরি দাবি করেছেন, নির্বাচন কমিশন “খেলা খেলছে” এবং তা নাকি একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলকে সুবিধা করে দেওয়ার জন্য। তিনি অভিযোগ করেন, বিরোধী দলের পছন্দের অফিসারদের বসানো হচ্ছে।
আরও বিস্ফোরক অভিযোগ হিসেবে তিনি বলেছেন, তাঁর সরকারের গুরুত্বপূর্ণ আধিকারিকদের সরিয়ে দেওয়া হয়েছে কোনো পরামর্শ ছাড়াই। এমনকি তিনি এই পদক্ষেপকে “anti-women” এবং “anti-Bengali” বলেও উল্লেখ করেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বাংলার প্রশাসনিক কাঠামোকে দুর্বল করার চেষ্টা চলছে।
এই সমস্ত মন্তব্যের মধ্যে দিয়ে স্পষ্ট যে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়েই বড় প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর বক্তব্যে বারবার উঠে এসেছে—নির্বাচন কমিশন যদি নিরপেক্ষ না থাকে, তাহলে গণতন্ত্র বিপদের মুখে পড়বে।
সব মিলিয়ে, ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে হঠাৎ করেই রাজ্যের মুখ্য সচিব স্বরাষ্ট্র সচিব সহ একাধিক পুলিশ আধিকারিকের বদলি থেকে শুরু করে এই রিটার্নিং অফিসার বদলিকে কেন্দ্র করে যে রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে, তা আগামী দিনে আরও বাড়বে বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। এই সংঘাত শুধু প্রশাসনিক নয়, বরং কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্ক এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ওপরও বড় প্রশ্ন তুলে দিচ্ছে।