নির্বাচন কমিশনের ‘অ্যাকশন’ না কি রাজনৈতিক চাল? সরব মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়
রাজ্যের বেশ কয়েক জন আমলা এবং পুলিশ আধিকারিককে তাঁদের পদ থেকে অপসারণ করে নির্বাচন কমিশন। বুধবার রাত পর্যন্ত তা অব্যাহত ছিল। সেই সব পদে নতুন আধিকারিকও নিয়োগ করে দেওয়া হয়। শুধু তা-ই নয়, কমিশন স্পষ্ট জানায়, যাঁদের অপসারণ করা হচ্ছে, তাঁদের এ রাজ্যে নির্বাচন সংক্রান্ত কোনও কাজে আপাতত আর নিয়োগ করা যাবে না!
মধুরিমা সেনগুপ্ত, কলকাতা : পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে ভোটের আগমুহূর্তে আবারও উত্তেজনার পারদ চড়তে শুরু করেছে। নির্বাচন কমিশনের ধারাবাহিক প্রশাসনিক বদলিকে ঘিরে তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক, আর সেই বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সম্প্রতি তিনি নিজের ফেসবুক পোস্টে সরাসরি আক্রমণ শানিয়েছেন ভারতের নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে, যা রাজনৈতিক মহলে নতুন করে জল্পনার জন্ম দিয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত গত রবিবার থেকেই। ভোটের দিন ঘোষণার পরেই, মধ্যরাতে আচমকাই রাজ্যের মুখ্য সচিব ও স্বরাষ্ট্র সচিবের বদলি করে নির্বাচন কমিশন। এরপর একের পর এক পুলিশ আধিকারিকদেরও সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কমিশনের তরফে সাধারণত এই ধরনের পদক্ষেপকে “নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করার প্রক্রিয়া” হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। কিন্তু এইবার ঘটনাগুলোর ধারাবাহিকতা এবং সময়কাল নিয়ে প্রশ্ন তুলছে শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস।
মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর ফেসবুক পোস্টে দাবি করেছেন, এই বদলিগুলো শুধুমাত্র প্রশাসনিক নয়, বরং এর পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে। তাঁর অভিযোগ, নির্বাচনের আগে রাজ্যের প্রশাসনিক কাঠামোকে দুর্বল করে দেওয়ার চেষ্টা চলছে, যাতে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলা যায়। তিনি আরও ইঙ্গিত করেছেন যে এই পদক্ষেপগুলো বিজেপির সুবিধা করে দিতে পারে।
অন্যদিকে নির্বাচন কমিশনের অবস্থান সম্পূর্ণ আলাদা। তাদের মতে, নির্বাচনের আগে প্রশাসনে নিরপেক্ষতা বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, এবং কোনও আধিকারিক যদি দীর্ঘদিন একই জায়গায় থাকেন বা পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ ওঠে, তাহলে বদলি করা নিয়মের মধ্যেই পড়ে। অতীতে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যেই এই ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে কমিশনের যুক্তি।
নির্বাচন কমিশনের এই পদক্ষেপ নতুন নয়, তবে এত দ্রুত ও ধারাবাহিক বদলি হওয়ায় রাজনৈতিক বিতর্ক বাড়ছে। বিশেষ করে ভোটের ঠিক আগে এই সিদ্ধান্তগুলি নেওয়ায় শাসক ও বিরোধী শিবিরের মধ্যে পারস্পরিক সন্দেহ আরও তীব্র হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, এটি আসলে কেন্দ্র-রাজ্য সংঘাতের আরেকটি প্রতিফলন। পশ্চিমবঙ্গে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতা নিয়ে টানাপোড়েন চলছে, এবং নির্বাচন এলেই সেই দ্বন্দ্ব আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এই পরিস্থিতিতে সাধারণ ভোটারদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হওয়াটাই স্বাভাবিক।
সব মিলিয়ে প্রশ্নটা এখন আর শুধু বদলি নিয়ে নয়, বরং নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে। নির্বাচন কমিশন কি সত্যিই নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করছে, নাকি রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়ে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে—এই বিতর্কই এখন রাজ্যের রাজনীতির কেন্দ্রে। আর এই বিতর্ক যত বাড়বে, ততই নির্বাচনের উত্তাপ আরও বাড়বে, সেটাই এখন পরিষ্কার।