ডিলিমিটেশন বিল ফিরে আসছে: ৫০% আসন বৃদ্ধি হলে পশ্চিমবঙ্গ লাভবান হবে নাকি ক্ষতিগ্রস্ত?
ভারতের রাজনীতিতে আবারও আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে ডিলিমিটেশন বা নির্বাচনী কেন্দ্র পুনর্বিন্যাস। কেন্দ্রের এনডিএ সরকার লোকসভা আসন সংখ্যা প্রায় ৫০ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব নিয়ে নতুন করে এগোতে পারে বলে সম্প্রতি ইঙ্গিত মিলেছে। এই প্রস্তাব কার্যকর হলে বর্তমান ৫৪৩টি লোকসভা আসন বেড়ে ৮০০-রও বেশি হতে পারে। তবে এই বিতর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হল—পশ্চিমবঙ্গের লাভ হবে, নাকি ক্ষতি?
মধুরিমা সেনগুপ্ত, কলকাতা : ভারতের রাজনীতিতে আবারও আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে ডিলিমিটেশন বা নির্বাচনী কেন্দ্র পুনর্বিন্যাস। কেন্দ্রের এনডিএ সরকার লোকসভা আসন সংখ্যা প্রায় ৫০ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব নিয়ে নতুন করে এগোতে পারে বলে সম্প্রতি ইঙ্গিত মিলেছে। এই প্রস্তাব কার্যকর হলে বর্তমান ৫৪৩টি লোকসভা আসন বেড়ে ৮০০-রও বেশি হতে পারে। তবে এই বিতর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হল—পশ্চিমবঙ্গের লাভ হবে, নাকি ক্ষতি?
প্রথমেই বুঝে নেওয়া দরকার, ডিলিমিটেশন আসলে কী। দেশের জনসংখ্যার পরিবর্তনের ভিত্তিতে লোকসভা ও বিধানসভা কেন্দ্রগুলির সীমানা পুনর্নির্ধারণ করাকেই ডিলিমিটেশন বলা হয়। ভারতে শেষ বড় ডিলিমিটেশন হয়েছিল ১৯৭০-এর দশকে। এরপর ১৯৭১ সালের জনগণনার ভিত্তিতে রাজ্যগুলির লোকসভা আসনের সংখ্যা কার্যত স্থির করে দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তী কয়েক দশকে দেশের জনসংখ্যার চিত্র অনেক বদলালেও আসন সংখ্যা সেইভাবে পরিবর্তিত হয়নি।
বর্তমান বিতর্কের সূত্রপাত হয়েছে কারণ কেন্দ্র সরকার এমন একটি ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করছে, যেখানে প্রতিটি রাজ্যের লোকসভা আসন প্রায় ৫০ শতাংশ বাড়ানো হবে। সরকারপক্ষের দাবি, এতে কোনও রাজ্যের বর্তমান প্রতিনিধিত্ব কমবে না এবং দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলিও ক্ষতিগ্রস্ত হবে না।
পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে এর অর্থ কী? বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গে ৪২টি লোকসভা আসন রয়েছে। যদি সব রাজ্যের ক্ষেত্রে সমানভাবে ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি প্রয়োগ করা হয়, তাহলে বাংলার আসন সংখ্যা প্রায় ৬৩-এ পৌঁছতে পারে। যদিও চূড়ান্ত সংখ্যা এখনও নির্ধারিত নয় এবং তা আইন, জনগণনার তথ্য ও ডিলিমিটেশন কমিশনের সুপারিশের ওপর নির্ভর করবে।
এখানেই বাংলার সম্ভাব্য লাভের বিষয়টি সামনে আসে। প্রথমত, বেশি আসন মানে সংসদে পশ্চিমবঙ্গের প্রতিনিধিত্ব বাড়বে। বর্তমানে একটি লোকসভা কেন্দ্রের অধীনে অনেক ক্ষেত্রে ২০ লক্ষেরও বেশি মানুষ রয়েছেন। জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে বহু কেন্দ্র অত্যন্ত বড় হয়ে গিয়েছে। নতুন কেন্দ্র তৈরি হলে সাংসদদের পক্ষে স্থানীয় সমস্যার দিকে বেশি নজর দেওয়া সম্ভব হতে পারে। দ্বিতীয়ত, উত্তরবঙ্গ, জঙ্গলমহল বা দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়া শহরতলির এলাকাগুলিতে নতুন রাজনৈতিক গুরুত্ব তৈরি হতে পারে।
তবে লাভের পাশাপাশি কিছু প্রশ্নও রয়েছে। ডিলিমিটেশন শুধু আসন বাড়ানোর বিষয় নয়, কেন্দ্রগুলির সীমানাও বদলাতে পারে। এর ফলে বহু পুরনো রাজনৈতিক সমীকরণ পাল্টে যেতে পারে। যে কেন্দ্র দীর্ঘদিন ধরে কোনও একটি দলের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত, সেখানকার ভোটার বিন্যাস বদলে গেলে ফলাফলও বদলাতে পারে। পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেস, বিজেপি, কংগ্রেস এবং বামপন্থী দলগুলির কাছে এই কারণেই ডিলিমিটেশন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বিষয়।
আরও একটি বড় বিতর্ক হল জনসংখ্যার ভিত্তিতে প্রতিনিধিত্ব নির্ধারণের প্রশ্ন। কিছু বিশেষজ্ঞের মতে, শুধুমাত্র জনসংখ্যার ভিত্তিতে আসন বণ্টন করলে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে সফল রাজ্যগুলির তুলনায় বেশি জনসংখ্যার রাজ্যগুলি অতিরিক্ত সুবিধা পেতে পারে। এই কারণেই সাম্প্রতিক আলোচনায় সরকার "সকল রাজ্যের জন্য সমানুপাতিক ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি"র কথা বলছে। এর উদ্দেশ্য হল কোনও রাজ্য যাতে নিজেকে বঞ্চিত মনে না করে।
পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, বেশি লোকসভা আসন মানে ভবিষ্যতের নির্বাচনে আরও বড় লড়াই। বর্তমানে দিল্লির ক্ষমতার অঙ্কে পশ্চিমবঙ্গ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আসন সংখ্যা বাড়লে জাতীয় রাজনীতিতে বাংলার গুরুত্ব আরও বাড়তে পারে। একইসঙ্গে নতুন কেন্দ্র গঠনের ফলে অনেক নতুন রাজনৈতিক মুখেরও উত্থান ঘটতে পারে।
তবে একটা বিষয় পরিষ্কার করে বলা দরকার। ডিলিমিটেশন নিয়ে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। বিল নিয়ে রাজনৈতিক মতভেদ রয়েছে এবং সংসদে প্রয়োজনীয় সমর্থন পাওয়াও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ফলে পশ্চিমবঙ্গে ঠিক কতটি নতুন আসন হবে বা কোন এলাকার সীমানা কীভাবে বদলাবে, তা এখনই নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।
সব মিলিয়ে, প্রস্তাবিত ৫০ শতাংশ আসন বৃদ্ধি কার্যকর হলে সংসদে প্রতিনিধিত্ব বাড়ার সম্ভাবনাই বেশি। কিন্তু সেই সঙ্গে বদলে যেতে পারে বহু বছরের রাজনৈতিক সমীকরণ, নির্বাচনী কৌশল এবং ভোটের অঙ্ক। তাই ডিলিমিটেশন শুধু একটি প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নয়, আগামী দশকের ভারতীয় রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠতে চলেছে।