নিয়োগ কেলেঙ্কারির 'মাস্টার ফাইল' কি খুলতে চলেছে?১০০ কোটির গল্পে কার ঘুম উড়ল?

প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি মামলায় সোমবার সল্টলেকের সিজিও কমপ্লেক্সে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি)-র সামনে হাজির হলেন তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়।

নিয়োগ কেলেঙ্কারির 'মাস্টার ফাইল' কি খুলতে চলেছে?১০০ কোটির গল্পে কার ঘুম উড়ল?

মধুরিমা সেনগুপ্ত, কলকাতা : প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি মামলায় সোমবার সল্টলেকের সিজিও কমপ্লেক্সে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি)-র সামনে হাজির হলেন তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। সকাল প্রায় ১১টা নাগাদ তিনি ইডি দফতরে পৌঁছন। রাজনৈতিক মহলে এই হাজিরাকে ঘিরে ব্যাপক জল্পনা তৈরি হলেও তদন্তকারীদের কাছে বিষয়টি শুধুমাত্র আরেকটি রুটিন হাজিরা নয়। কারণ গত কয়েক বছরে নিয়োগ দুর্নীতি তদন্তে উঠে আসা একাধিক তথ্য, অডিও ক্লিপ, আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ এবং চার্জশিটে উল্লেখিত কয়েকটি দাবি সরাসরি বা পরোক্ষভাবে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নামকে আলোচনায় এনেছে। যদিও তিনি বারবার সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এবং নিজেকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার বলে দাবি করেছেন।

তদন্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হল সুজয় কৃষ্ণ ভদ্র ওরফে "কালিঘাটের কাকু"-কে ঘিরে উঠে আসা তথ্য। ইডি আদালতে জমা দেওয়া নথিতে দাবি করেছিল যে সুজয় কৃষ্ণ ভদ্র নিয়োগ দুর্নীতির আর্থিক দিকগুলি পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতেন। এমনকি আদালতে জমা দেওয়া তদন্ত-সংক্রান্ত নথিতে ইডি দাবি করেছিল যে সুজয় কৃষ্ণ ভদ্র অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের আর্থিক বিষয়গুলিও দেখভাল করতেন এবং দু'জনের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের আর্থিক লেনদেন খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

নিয়োগ দুর্নীতি মামলায় কুন্তল ঘোষ ও শান্তনু বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভূমিকা নিয়েও তদন্তকারীরা দীর্ঘদিন ধরে অনুসন্ধান চালাচ্ছেন। ইডি আদালতে দাবি করেছিল, কুন্তল ঘোষ ও শান্তনু বন্দ্যোপাধ্যায় সুজয় কৃষ্ণ ভদ্রের হয়ে মধ্যস্থতাকারীর কাজ করতেন। চাকরি পাইয়ে দেওয়ার নামে সংগ্রহ করা অর্থ বিভিন্ন স্তরে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁদের ভূমিকার অভিযোগ সামনে আসে। তদন্তে দাবি করা হয়, সংগৃহীত টাকা কখনও সরাসরি, কখনও আবার ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের মাধ্যমে সুজয় কৃষ্ণ ভদ্রের কাছে পৌঁছত।

সবচেয়ে বিতর্কিত তথ্যগুলির মধ্যে রয়েছে সিবিআই-এর চার্জশিটে উল্লেখিত একটি কথোপকথনের দাবি। সেই চার্জশিটে বলা হয়েছিল, সুজয় কৃষ্ণ ভদ্র, শান্তনু বন্দ্যোপাধ্যায় এবং কুন্তল ঘোষের মধ্যে কথিত আলোচনায় অতিরিক্ত প্রায় ২০০০ প্রার্থীর কাছ থেকে ঘুষ সংগ্রহের পরিকল্পনার কথা উঠে আসে। চার্জশিটে দাবি করা হয়, এই প্রক্রিয়ায় প্রায় ১০০ কোটি টাকা তোলার পরিকল্পনা ছিল এবং সেই অর্থের একটি অংশ বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তির কাছে পৌঁছানোর কথা আলোচনা হয়েছিল। তবে এই দাবিগুলি তদন্তকারী সংস্থার অভিযোগমাত্র; আদালতে এখনও সেগুলি চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়নি।

একই চার্জশিটে আরও দাবি করা হয়েছিল যে নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়, সুজয় কৃষ্ণ ভদ্র এবং অন্য কয়েকজনের মধ্যে অর্থ বণ্টন নিয়ে মতবিরোধের কথাও কথোপকথনে উঠে এসেছে। সিবিআই সেই অডিওকে তদন্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হিসেবে দেখালেও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের আইনজীবীরা বারবার দাবি করেছেন যে কোনও অডিওতে তাঁর কণ্ঠস্বর নেই এবং শুধুমাত্র অন্য কারও কথোপকথনে নাম উচ্চারণ করা মানেই অভিযোগ প্রমাণিত হয় না।

বিশেষ করে সুজয় কৃষ্ণ ভদ্রের সঙ্গে আর্থিক সম্পর্ক, বিভিন্ন সংস্থার লেনদেন, নিয়োগ দুর্নীতির অর্থের সম্ভাব্য গতিপথ এবং তদন্তে উঠে আসা নথিপত্র নিয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে বলেই ধারণা সংশ্লিষ্ট মহলের।

সোমবারের জেরা শেষ পর্যন্ত তদন্তে নতুন কোনও মোড় আনতে পারে কি না, সেদিকেই এখন নজর রাজনৈতিক মহল ও তদন্তকারীদের। কারণ নিয়োগ দুর্নীতি মামলার আর্থিক লেনদেনের রহস্য এখনও পুরোপুরি উন্মোচিত হয়নি, আর সেই কারণেই সুজয় কৃষ্ণ ভদ্র, কুন্তল ঘোষ, শান্তনু বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তাঁদের কথিত আর্থিক নেটওয়ার্ককে ঘিরে প্রশ্ন এখনও তদন্তের কেন্দ্রে রয়ে গেছে।