ভারত-রাশিয়া সম্পর্ক ঘিরে আমেরিকার নতুন চাপ! রাশিয়ার তেল কিনলেই কি এবার ১০০% শুল্কের মুখে ভারত?

রাশিয়ার তেল কেনার কারণে ভারতের উপর সর্বোচ্চ ১০০% পর্যন্ত শুল্ক আরোপের প্রস্তাব মার্কিন সেনেটে এগিয়েছে। ১০০% শুল্ক কি এখনই কার্যকর? ভারত-আমেরিকা-রাশিয়া সম্পর্কের সর্বশেষ আপডেট জানুন।

ভারত-রাশিয়া সম্পর্ক ঘিরে আমেরিকার নতুন চাপ! রাশিয়ার তেল কিনলেই কি এবার ১০০% শুল্কের মুখে ভারত?

মধুরিমা সেনগুপ্ত, কলকাতা: একদিকে রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের দীর্ঘদিনের কৌশলগত সম্পর্ক, অন্যদিকে আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক সমীকরণ—এই দুইয়ের মাঝে এবার নতুন করে তৈরি হচ্ছে চাপ। ওয়াশিংটন থেকে আসা সাম্প্রতিক বার্তা ঘিরে ভারতের সামনে বড় প্রশ্ন—রাশিয়া থেকে তেল কেনার নীতিতে কি এবার বদল আনতে হবে? নাকি জাতীয় স্বার্থে আগের অবস্থানেই অনড় থাকবে নয়াদিল্লি?

ঘটনার কেন্দ্রে রয়েছে মার্কিন কংগ্রেসে এগিয়ে যাওয়া একটি রাশিয়া নিষেধাজ্ঞা বিল। প্রস্তাবিত আইনে রাশিয়ার তেল ও গ্যাসের বড় ক্রেতা দেশগুলির উপর সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের ক্ষমতা মার্কিন প্রেসিডেন্টকে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। ভারতও সম্ভাব্যভাবে এই তালিকায় পড়তে পারে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, এখনও ভারতের উপর ১০০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর হয়নি। এটি এখনও আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়ার মধ্যে থাকা একটি প্রস্তাব, যা পরবর্তী ধাপে কীভাবে কার্যকর হবে এবং আদৌ হবে কি না, সেটাই এখন নজরে।

কী ঘটেছে আমেরিকায়?

মার্কিন সেনেট রাশিয়ার বিরুদ্ধে নতুন করে কড়া নিষেধাজ্ঞা আরোপের লক্ষ্যে আনা বিলকে এগিয়ে দিয়েছে। রয়টার্সের রিপোর্ট অনুযায়ী, ২৮ জুলাই মার্কিন সেনেটে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতায় এই বিল এগিয়ে যায়। বিলটির মূল লক্ষ্য রাশিয়ার জ্বালানি রফতানি থেকে আয় কমানো এবং ইউক্রেন যুদ্ধের জন্য মস্কোর অর্থনৈতিক সক্ষমতার উপর চাপ বাড়ানো।

 অর্থাৎ, কোনও দেশ রাশিয়া থেকে জ্বালানি আমদানি চালিয়ে গেলে সেই দেশের পণ্য আমেরিকার বাজারে ঢোকার সময় অতিরিক্ত ও অত্যন্ত উচ্চ হারে শুল্কের মুখে পড়তে পারে। প্রস্তাবিত সর্বোচ্চ হার ১০০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে।

কেন ভারতের নাম উঠে আসছে?

রাশিয়া দীর্ঘদিন ধরেই ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অপরিশোধিত তেল সরবরাহকারী দেশ। ইউক্রেন যুদ্ধের পর পশ্চিমা দেশগুলির নিষেধাজ্ঞার কারণে রাশিয়ার তেল তুলনামূলকভাবে আকর্ষণীয় দামে পাওয়া গেলে ভারতীয় রিফাইনারিগুলি রাশিয়া থেকে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল আমদানি শুরু করে।

আমেরিকার আপত্তির মূল জায়গা এখানেই। ওয়াশিংটনের যুক্তি, রাশিয়া থেকে তেল কেনার মাধ্যমে যে অর্থ মস্কো পাচ্ছে, তা ইউক্রেন যুদ্ধ চালানোর ক্ষেত্রে পরোক্ষভাবে সহায়ক হচ্ছে। সেই কারণেই এবার শুধু রাশিয়ার উপর নয়, রাশিয়ার জ্বালানির বড় ক্রেতা দেশগুলির উপরও অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করার চেষ্টা চলছে। প্রস্তাবিত আইনের আওতায় ভারত ও চিনের মতো বড় ক্রেতা দেশগুলি সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে।

১০০% শুল্ক কি এখনই বসছে ভারতের উপর?

না। এই বিষয়টি পরিষ্কারভাবে বোঝা জরুরি।

বর্তমান পরিস্থিতিতে মার্কিন সেনেটে বিলটি এগিয়েছে এবং প্রস্তাবিত আইনে সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের ক্ষমতার কথা রয়েছে। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে আজ থেকেই ভারতের সমস্ত পণ্যের উপর ১০০ শতাংশ শুল্ক বসে গেল।

বিলটি এখনও মার্কিন আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়ার অংশ। পরবর্তী সময়ে এর চূড়ান্ত রূপ, প্রেসিডেন্টের অনুমোদন এবং বাস্তবে কীভাবে প্রয়োগ করা হবে—সেগুলি গুরুত্বপূর্ণ। ফলে এখনই ‘ভারতের উপর ১০০% শুল্ক চাপিয়ে দিল আমেরিকা’ বলা তথ্যগতভাবে সঠিক হবে না। বরং বলা যায়, রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রাখার কারণে ভারত ভবিষ্যতে মার্কিন শুল্কচাপের মুখে পড়তে পারে।

ভারতের সামনে এখন কী চ্যালেঞ্জ?

এই পরিস্থিতি ভারতের জন্য নিঃসন্দেহে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর। কারণ রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক শুধু তেল আমদানিতে সীমাবদ্ধ নয়। প্রতিরক্ষা, জ্বালানি, মহাকাশ এবং দীর্ঘদিনের কৌশলগত সহযোগিতার ক্ষেত্রেও দুই দেশের সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ।

অন্যদিকে আমেরিকাও ভারতের অন্যতম বড় বাণিজ্যিক অংশীদার। ফলে রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে আমেরিকার সম্ভাব্য শুল্কচাপ সামলানো—নয়াদিল্লির সামনে বড় কূটনৈতিক ভারসাম্যের পরীক্ষা হতে পারে।

বিশেষ করে যদি ভবিষ্যতে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক বাস্তবে কার্যকর করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তাহলে আমেরিকার বাজারে ভারতীয় পণ্যের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হবে। রফতানিকারকদের খরচ বাড়তে পারে এবং ভারতীয় পণ্যের দাম মার্কিন বাজারে তুলনামূলকভাবে বেড়ে যেতে পারে।

তবে এর প্রভাব কতটা হবে, তা নির্ভর করবে শেষ পর্যন্ত আইনটি কীভাবে কার্যকর হয় এবং কোন কোন দেশ ও পণ্যের উপর কী ধরনের শুল্ক আরোপ করা হয় তার উপর।

ভারতের জন্য আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক

এই চাপ এমন সময়ে সামনে এল, যখন ভারত-আমেরিকা বাণিজ্য সম্পর্ক নিয়েও নানা আলোচনা চলছে। চলতি মাসেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের Section 301 ব্যবস্থার অধীনে ভারতের পণ্যের উপর অতিরিক্ত ১০ শতাংশ শুল্ক নির্ধারণের কথা জানিয়েছিল ভারত সরকারের প্রেস ইনফরমেশন ব্যুরো। PIB-এর তথ্য অনুযায়ী, এটি আগে প্রস্তাবিত ১২.৫ শতাংশের তুলনায় কম এবং ভারতকে সংশ্লিষ্ট দেশগুলির মধ্যে তুলনামূলকভাবে নিম্ন শুল্ক স্তরে রাখা হয়েছে। ফলে রাশিয়া-সংক্রান্ত সম্ভাব্য নতুন শুল্কের বিষয়টি ভারত-মার্কিন বাণিজ্য সম্পর্কের জন্য আলাদা একটি বড় চাপ তৈরি করতে পারে।

এখন কী হতে পারে?

এই মুহূর্তে নজর থাকবে তিনটি বিষয়ের উপর—প্রথমত, মার্কিন কংগ্রেসে বিলটির পরবর্তী প্রক্রিয়া; দ্বিতীয়ত, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন শেষ পর্যন্ত এই ক্ষমতা কীভাবে ব্যবহার করে; এবং তৃতীয়ত, ভারত সরকার এই সম্ভাব্য চাপের বিরুদ্ধে কী কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক কৌশল নেয়।

সব মিলিয়ে, ভারতের উপর ১০০ শতাংশ শুল্ক এখনই কার্যকর হয়নি, কিন্তু রাশিয়ার সঙ্গে জ্বালানি বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে আমেরিকার চাপ যে নতুন মাত্রা পেয়েছে, তা স্পষ্ট। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধকে ঘিরে আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রভাব এবার সরাসরি ভারতের বাণিজ্য ও জ্বালানি নীতির উপরও পড়তে পারে।