NEET বিতর্কের পর Anti-Paper Leak Bill 2026: শাস্তি কত, কী বদলাবে?
NEET বিতর্কের পর কেন্দ্রের Anti-Paper Leak Bill 2026। প্রশ্নফাঁস ও পরীক্ষায় অনিয়মে ১০ বছর জেল, ৫০ লক্ষ টাকা জরিমানা, service provider ও organised crime-এর শাস্তি, Special Task Force ও Fast Track Court—জেনে নিন বিস্তারিত।
মধুরিমা সেনগুপ্ত, কলকাতা : পরীক্ষার হলে বসে ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন দেখেন লক্ষ লক্ষ পড়ুয়া। কিন্তু সেই পরীক্ষার প্রশ্নপত্রই যদি পরীক্ষার আগেই ফাঁস হয়ে যায়, তাহলে শুধু একটি পরীক্ষা নয়—ধাক্কা খায় গোটা শিক্ষা ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা। NEET-সহ একাধিক পরীক্ষাকে ঘিরে প্রশ্নফাঁস ও অনিয়মের অভিযোগে দেশজুড়ে তৈরি হওয়া ক্ষোভের আবহেই এবার পরীক্ষায় কারচুপি ও প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিরুদ্ধে আরও কড়া পদক্ষেপের পথে কেন্দ্র।
কেন্দ্রীয় সরকার ২০২৪ সালের Public Examinations (Prevention of Unfair Means) Act আরও শক্তিশালী করতে Public Examinations (Prevention of Unfair Means) Amendment Bill, 2026 এনেছে। ২৭ জুলাই লোকসভায় বিলটি পেশ করা হয়, এবং সংসদে বিলটি নিয়ে আলোচনা ঘিরে সরকার ও বিরোধীদের মধ্যে তীব্র রাজনৈতিক চাপানউতোরও দেখা যায়। প্রস্তাবিত সংশোধনীর মূল লক্ষ্য হল—প্রশ্নফাঁস ও পরীক্ষায় অনিয়মের ঘটনায় দ্রুত তদন্ত, দ্রুত বিচার এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা।
কেন এই নতুন সংশোধনী বিল?
প্রশ্নফাঁস ও পরীক্ষায় অনিয়ম নিয়ে গত কয়েক বছরে বারবার বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ২০২৬ সালের NEET-UG পরীক্ষা নিয়েও প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ সামনে আসে এবং পরীক্ষা বাতিল করে পরে পুনরায় আয়োজন করা হয়। এই পরিস্থিতিতে পরীক্ষাব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা বজায় রাখা এবং সংগঠিতভাবে পরীক্ষা-কেন্দ্রিক অপরাধে যুক্ত চক্রগুলির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেছে কেন্দ্র।
সরকারের বক্তব্য, শুধুমাত্র শাস্তির মাত্রা বাড়ালেই হবে না, তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়াকেও দ্রুত করতে হবে। সেই লক্ষ্যেই সংশোধনী বিলে শাস্তি বাড়ানোর পাশাপাশি Special Task Force, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তদন্ত এবং Special Fast Track Court-এর মতো ব্যবস্থার প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
প্রশ্নফাঁস বা পরীক্ষায় অনিয়ম করলে কত শাস্তি হতে পারে?
প্রস্তাবিত সংশোধনী অনুযায়ী, কোনও ব্যক্তি পরীক্ষায় ‘unfair means’ বা অনৈতিক পদ্ধতি ব্যবহার করে অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হলে বর্তমান আইনের তুলনায় শাস্তি বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে। বর্তমানে যেখানে তিন থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত জেল এবং সর্বোচ্চ ১০ লক্ষ টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে, সংশোধনীতে সেই শাস্তি বাড়িয়ে ন্যূনতম পাঁচ বছর থেকে সর্বোচ্চ ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং সর্বোচ্চ ৫০ লক্ষ টাকা জরিমানার প্রস্তাব করা হয়েছে।
তবে এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট—এই শাস্তি বিলের প্রস্তাবিত বিধান। সংসদে সংশোধনীটি পাস হয়ে কার্যকর না হওয়া পর্যন্ত এটিকে চূড়ান্ত আইন হিসেবে ধরা যাবে না।
শুধু প্রশ্নফাঁসকারী নয়, দায় পড়বে পরিষেবা প্রদানকারী সংস্থার উপরও
পরীক্ষা পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত কোনও service provider বা পরিষেবা প্রদানকারী সংস্থা অনিয়মে জড়িত থাকলে তাদের বিরুদ্ধেও কড়া ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। বর্তমানে সর্বোচ্চ এক কোটি টাকা জরিমানার বিধান থাকলেও সংশোধনীতে তা বাড়িয়ে সর্বোচ্চ পাঁচ কোটি টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া অনিয়মে যুক্ত কোনও service provider-কে সরকারি পরীক্ষা পরিচালনার দায়িত্ব থেকে চার বছরের পরিবর্তে আট বছর পর্যন্ত দূরে রাখার প্রস্তাব রয়েছে। অর্থাৎ পরীক্ষা পরিচালনার দায়িত্বে থাকা বেসরকারি সংস্থা বা সংশ্লিষ্ট পরিষেবা প্রদানকারীদের জবাবদিহি আরও বাড়ানোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
সংস্থার দায়িত্বে থাকা আধিকারিকদের জন্যও কঠোর শাস্তির প্রস্তাব
শুধু সংস্থাকে জরিমানা করেই বিষয়টি শেষ করার কথা বলা হয়নি। কোনও service provider-এর দায়িত্বে থাকা managerial personnel পরীক্ষায় অনিয়মের সঙ্গে যুক্ত থাকলে তাঁদের বিরুদ্ধেও কঠোর শাস্তির প্রস্তাব রয়েছে।
বর্তমান আইনে এই ধরনের অপরাধে তিন থেকে দশ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং এক কোটি টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান রয়েছে। সংশোধনীতে কারাদণ্ডের ন্যূনতম মেয়াদ বাড়িয়ে পাঁচ বছর করার পাশাপাশি সর্বোচ্চ জরিমানা পাঁচ কোটি টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। সর্বোচ্চ কারাদণ্ড ১০ বছরই রাখা হয়েছে।
সংগঠিত প্রশ্নফাঁস চক্রের বিরুদ্ধে আরও কড়া ব্যবস্থা
প্রশ্নফাঁস যদি কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা না হয়ে একটি সংগঠিত অপরাধচক্রের মাধ্যমে পরিচালিত হয়, সেক্ষেত্রেও শাস্তি বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে। সংশোধনী বিলে organised crime-এর ক্ষেত্রে ন্যূনতম সাত বছর কারাদণ্ড এবং ন্যূনতম ১০ কোটি টাকা জরিমানার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। কারাদণ্ডের সর্বোচ্চ সীমা ১০ বছর পর্যন্ত হতে পারে।
অর্থাৎ, প্রশ্নফাঁসের পিছনে থাকা বড় চক্র, সংগঠিত অপরাধ এবং পরীক্ষার সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন পক্ষের যোগসাজশকে আরও গুরুত্ব দিয়ে দেখার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
তদন্ত শেষ করতে হবে দুই মাসের মধ্যে
নতুন সংশোধনীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব হল তদন্তের সময়সীমা। বিল অনুযায়ী, এই আইনের আওতায় কোনও অপরাধের তদন্ত দুই মাসের মধ্যে শেষ করার প্রস্তাব রয়েছে।
এছাড়া এই ধরনের মামলার তদন্তে কেন্দ্রীয় সরকার Special Task Force গঠন করতে পারবে। এর উদ্দেশ্য হল তদন্তকে আরও দ্রুত এবং নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসা।
দ্রুত বিচারের জন্য Special Fast Track Court
প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় তদন্ত শেষ হলেও মামলা দীর্ঘদিন আদালতে চলতে থাকলে কঠোর শাস্তির উদ্দেশ্য অনেকটাই দুর্বল হয়ে যেতে পারে। সেই কারণেই সংশোধনী বিলে প্রতিটি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে এই আইনের অধীনে হওয়া অপরাধের বিচার করার জন্য একটি Special Fast Track Court নির্দিষ্ট করার প্রস্তাব রয়েছে।
এর পাশাপাশি Special Public Prosecutor নিয়োগ এবং আপিল দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থার কথাও কেন্দ্র জানিয়েছে। অর্থাৎ শুধু অপরাধের শাস্তি বাড়ানো নয়, পুরো বিচারপ্রক্রিয়াকে দ্রুত করার উপরও জোর দেওয়া হয়েছে।
কোন কোন পরীক্ষায় এই আইন প্রযোজ্য?
এই আইন মূলত কেন্দ্রীয় সরকারের নির্দিষ্ট সরকারি পরীক্ষা পরিচালনাকারী সংস্থাগুলির পরীক্ষার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। এর আওতায় রয়েছে UPSC, SSC, Railway Recruitment Boards, Institute of Banking Personnel Selection এবং National Testing Agency (NTA)-র মতো সংস্থা। কেন্দ্রীয় সরকারের মন্ত্রক ও তাদের অধীনস্থ দফতর এবং কেন্দ্রের বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে নির্দিষ্ট করা অন্যান্য কর্তৃপক্ষের পরীক্ষাও এর আওতায় পড়তে পারে।
ফলে NEET-এর মতো NTA পরিচালিত পরীক্ষা এই আইনের আওতায় পড়ে। তবে মনে রাখতে হবে, এই সংশোধনী বিল মূলত *পরীক্ষায় অনিয়ম ও প্রশ্নফাঁসের সঙ্গে যুক্ত অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা আরও কঠোর করার প্রস্তাব* দিচ্ছে। এটি নিজে থেকে পরীক্ষার নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রতিটি প্রযুক্তিগত বা প্রশাসনিক সমস্যার সমাধান করে না।
সংসদে বিল ঘিরে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক চাপানউতোর
বিলটি এমন এক সময়ে সংসদে এসেছে, যখন NEET-সহ পরীক্ষার অনিয়ম নিয়ে রাজনৈতিক চাপ তুঙ্গে। ২৮ জুলাই লোকসভায় বিল নিয়ে আলোচনার আগে বিরোধী সাংসদদের প্রতিবাদে অধিবেশনেও উত্তেজনা তৈরি হয়। বিরোধীদের একাংশের বক্তব্য, শুধু শাস্তি বাড়ালেই প্রশ্নফাঁস বন্ধ হবে না; পরীক্ষাব্যবস্থার ব্যর্থতা, তদন্তের কার্যকারিতা এবং ছাত্রছাত্রীদের উপর পুলিশি পদক্ষেপের মতো বিষয় নিয়েও আলোচনা প্রয়োজন।
অন্যদিকে কেন্দ্রের বক্তব্য, পরীক্ষার স্বচ্ছতা এবং পড়ুয়াদের ভবিষ্যৎ রক্ষায় কঠোর আইন জরুরি। সরকার বিলটিকে দ্রুত তদন্ত ও বিচারের পাশাপাশি পরীক্ষাব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা পুনরুদ্ধারের একটি পদক্ষেপ হিসেবে তুলে ধরছে। ফলে বিলটি ঘিরে মূল বিতর্ক এখন শুধু শাস্তির মাত্রা নয়, বরং প্রশ্নফাঁস ঠেকাতে বাস্তবে কতটা কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে, তা নিয়েও।
এখন কী হবে?
এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, Public Examinations (Prevention of Unfair Means) Amendment Bill, 2026 এখনও একটি সংশোধনী বিল। এটি সংসদীয় প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এগিয়ে আইনে পরিণত হলে তবেই প্রস্তাবিত নতুন শাস্তি ও অন্যান্য বিধান কার্যকর হবে। ২৮ জুলাই পর্যন্ত লোকসভায় বিলটি নিয়ে আলোচনা চলছে এবং এর পরবর্তী সংসদীয় পদক্ষেপের দিকেই এখন নজর।
সব মিলিয়ে, NEET বিতর্ক এবং প্রশ্নফাঁস নিয়ে দেশজুড়ে তৈরি হওয়া ক্ষোভের মধ্যে কেন্দ্রের এই সংশোধনী বিল নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে— কঠোর শাস্তি কি সত্যিই প্রশ্নফাঁস বন্ধ করতে পারবে? নাকি শাস্তির পাশাপাশি পরীক্ষার প্রশ্ন তৈরি, সংরক্ষণ, পরিবহণ, ডিজিটাল নিরাপত্তা এবং পরীক্ষা পরিচালনার পুরো ব্যবস্থাতেই আরও বড় সংস্কার প্রয়োজন?