অবশেষে গ্রেফতার নির্মল ঘোষ! আরজি করের নয়া FIR-এ নাম, হঠাৎ কেন এই গ্রেফতার?
আরজি কর কাণ্ডে নতুন FIR ঘিরে বড় পদক্ষেপ। পানিহাটির প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়ক নির্মল ঘোষকে গ্রেফতারের খবর প্রকাশ্যে। দেহ সৎকার নিয়ে কী অভিযোগ, FIR-এ কার কার নাম? জানুন বিস্তারিত।
মধুরিমা সেনগুপ্ত, কলকাতা : আরজি কর কাণ্ডে দু’বছর পর তদন্তে ফের বড় মোড়। পানিহাটির প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়ক নির্মল ঘোষকে ওড়িশা থেকে গ্রেফতার করেছে ব্যারাকপুর পুলিশ কমিশনারেটের পুলিশ। আরজি করের তরুণী চিকিৎসকের দেহ তড়িঘড়ি সৎকারের অভিযোগে দায়ের হওয়া নতুন এফআইআর-এর ভিত্তিতেই এই গ্রেফতার বলে পুলিশ সূত্রে খবর। বৃহস্পতিবার, ১৩ অগস্ট সকালে ওড়িশার পুরী লাগোয়া একটি হোটেল থেকে নির্মল ঘোষকে পাকড়াও করা হয়।
কেন গ্রেফতার নির্মল ঘোষ?
২০২৪ সালের ৯ অগস্ট আরজি কর মেডিক্যাল কলেজের তরুণী চিকিৎসককে ধর্ষণ ও খুনের ঘটনার পর তাঁর দেহের সৎকার ঘিরে একাধিক প্রশ্ন উঠেছিল। সেই বিষয়টিই এবার নতুন তদন্তের কেন্দ্রে।
দাবি করা হয়েছে, ময়নাতদন্তের পর বাড়িতে দেহ পৌঁছনোর পর পরিবারের সম্মতি ও প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন থাকা সত্ত্বেও দ্রুত দেহ পানিহাটির নাটাগড় কদমতলা শ্মশানে নিয়ে গিয়ে সৎকার করা হয়েছিল। পরিবারের অভিযোগ, তাঁদের উপর দ্রুত দেহ সৎকারের জন্য চাপ তৈরি করা হয়েছিল এবং শেষ শ্রদ্ধা জানানোর পর্যাপ্ত সময়ও দেওয়া হয়নি।
এই অভিযোগের ভিত্তিতে নিহত চিকিৎসকের বাবা সোমবার, ১০ অগস্ট খড়দহ থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। তার ভিত্তিতেই নির্মল ঘোষ, সোমনাথ দে এবং সঞ্জীব মুখোপাধ্যায়ের নাম করে নতুন মামলা শুরু হয়। অভিযোগের মধ্যে রয়েছে অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র, তথ্যপ্রমাণ লোপাট এবং জোর করে কাজ করানোর মতো গুরুতর বিষয়।
কী ঘটেছিল পানিহাটির শ্মশানে?
নতুন তদন্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠেছে সৎকারের সময়কার ঘটনাক্রম নিয়ে। অভিযোগ অনুযায়ী, শ্মশানের রেজিস্টারে ওই দেহের সৎকারের সিরিয়াল তিন নম্বরে থাকার কথা থাকলেও পরে তা বদলে এক নম্বর করা হয়েছিল। পরিবারের কাছ থেকে নির্ধারিত সৎকারের খরচ নেওয়া হয়েছিল কি না এবং প্রয়োজনীয় নথিতে পরিবারের সদস্যদের স্বাক্ষর ছিল কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় এসেছে।
পুলিশ এখন খতিয়ে দেখছে, ওই সময়ে কারা শ্মশানে উপস্থিত ছিলেন, কে বা কারা দ্রুত সৎকারের উদ্যোগ নিয়েছিলেন এবং কোনও তথ্যপ্রমাণ গোপন বা নষ্ট করার চেষ্টা হয়েছিল কি না। প্রয়োজনে শ্মশানকর্মীদেরও জিজ্ঞাসাবাদ করা হতে পারে।
তবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল— এগুলি অভিযোগ ও তদন্তের বিষয়; আদালতে এখনও প্রমাণিত নয়।
কীভাবে ওড়িশায় ধরা পড়লেন নির্মল?
নতুন এফআইআর দায়ের হওয়ার পর নির্মল ঘোষের অবস্থান নিয়ে পুলিশের নজরদারি শুরু হয়। সংবাদমাধ্যমের রিপোর্ট অনুযায়ী, তিনি ওড়িশায় চলে গিয়েছিলেন এবং পুলিশের নজর এড়াতে নতুন ফোন ও সিমকার্ড ব্যবহার করছিলেন। পুরনো ফোন বন্ধ রাখা হয়েছিল বলে পুলিশ সূত্রের দাবি।
মোবাইল টাওয়ারের অবস্থান বিশ্লেষণ করে পুলিশ তাঁর গতিবিধির সন্ধান পায়। এরপর বৃহস্পতিবার সকালে পুরী লাগোয়া একটি হোটেলে অভিযান চালিয়ে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, নির্মল ঘোষকে ওড়িশার আদালতে তোলার পর ট্রানজিট রিমান্ডে কলকাতায় আনার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এরপর তাঁকে ব্যারাকপুর আদালতে হাজির করানো হতে পারে।
আরজি করের মূল মামলার সঙ্গে এই মামলা কি এক?
না। এটিই এই মুহূর্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তথ্য।
আরজি করের তরুণী চিকিৎসককে ধর্ষণ ও খুনের মূল মামলার তদন্ত সিবিআইয়ের হাতে। অন্যদিকে, দেহ সৎকারের সময় কথিত অনিয়ম, তড়িঘড়ি দাহ এবং সম্ভাব্য তথ্যপ্রমাণ নষ্টের অভিযোগকে কেন্দ্র করে খড়দহ থানায় যে নতুন এফআইআর হয়েছে, সেটি রাজ্য পুলিশের পৃথক তদন্ত।
অর্থাৎ নির্মল ঘোষের গ্রেফতারি সরাসরি মূল ধর্ষণ-খুনের মামলায় নতুন গ্রেফতার নয়; এটি দেহ সৎকারকে কেন্দ্র করে দায়ের হওয়া নতুন মামলার তদন্তের অংশ।
নির্মল ঘোষের রাজনৈতিক পরিচয়
নির্মল ঘোষ পানিহাটি বিধানসভা কেন্দ্র থেকে তৃণমূলের টিকিটে ২০১১, ২০১৬ এবং ২০২১ সালে পরপর তিন বার বিধায়ক নির্বাচিত হন। তিনি বিধানসভায় তৃণমূলের মুখ্য সচেতকের দায়িত্বেও ছিলেন। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তিনি প্রার্থী হননি; পানিহাটিতে তৃণমূল তাঁর ছেলে তীর্থঙ্কর ঘোষকে প্রার্থী করেছিল।
এর আগে জুলাই মাসে নির্মল ঘোষের ছেলে তীর্থঙ্কর ঘোষকেও অন্য একাধিক অভিযোগের মামলায় গ্রেফতার করা হয়েছিল। নির্মলকে অবশ্য সেই সময় প্রকাশ্যে দেখা যায়নি।
এখন তদন্ত কোন দিকে?
এই মুহূর্তে পুলিশের সামনে মূলত কয়েকটি প্রশ্ন—২০২৪ সালের ৯ অগস্ট ময়নাতদন্তের পর থেকে সৎকার পর্যন্ত ঠিক কী ঘটেছিল, কেন দেহ দ্রুত দাহ করা হয়েছিল, পরিবারের সম্মতি ও স্বাক্ষর সংক্রান্ত নিয়ম মানা হয়েছিল কি না এবং ওই প্রক্রিয়ায় নির্মল ঘোষ-সহ অভিযুক্তদের ভূমিকা কী ছিল।
১৩ অগস্ট ২০২৬-এর সর্বশেষ আপডেট অনুযায়ী, নির্মল ঘোষ গ্রেফতার হয়েছেন এবং তাঁকে কলকাতায় এনে আদালতে পেশ করার প্রক্রিয়া চলছে। নতুন এফআইআর-এর তদন্ত এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে। ফলে সামনে জিজ্ঞাসাবাদ, নথি পরীক্ষা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বয়ানের ভিত্তিতে আরও তথ্য প্রকাশ্যে আসতে পারে।
আরজি কর কাণ্ডের মূল বিচারপ্রক্রিয়ার পাশাপাশি দেহ সৎকার ঘিরে এই পৃথক তদন্ত শেষ পর্যন্ত কী তথ্য সামনে আনে, এখন সেদিকেই নজর।