আচ্ছে দিন নাকি মূল্যবৃদ্ধির দিন? তেলের দামে চাপে দেশ
পেট্রোল-ডিজেলের লাগাতার মূল্যবৃদ্ধিতে চাপে সাধারণ মানুষ। ২০১৪ থেকে ২০২৬ পর্যন্ত জ্বালানির দামের পরিবর্তন, করের হিসাব, আন্তর্জাতিক বাজারের প্রভাব এবং রাজনৈতিক তরজা— সব তথ্য নিয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন।
মধুরিমা সেনগুপ্ত, কলকাতা : ২০১৪ সালে কেন্দ্রে নরেন্দ্র মোদী সরকার ক্ষমতায় আসার সময় আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ছিল তুলনামূলক বেশি, কিন্তু তখন দেশের বহু শহরে পেট্রোলের দাম ছিল লিটার প্রতি প্রায় ৭০ থেকে ৭৫ টাকার মধ্যে। এরপর এক দশকের বেশি সময় কেটে গেলেও সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় অভিযোগ হয়ে দাঁড়িয়েছে জ্বালানির লাগাতার মূল্যবৃদ্ধি। সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধির পর দিল্লির মতো শহরে আবারও পেট্রোল ১০০ টাকার গণ্ডি ছাড়িয়েছে এবং ডিজেলের দামও দ্রুত বাড়ছে।
কলকাতাতেও পেট্রল ও ডিজ়েলের দাম বেড়েছে। লিটার প্রতি ২.৮৭ টাকা বেড়ে শহরে পেট্রলের নতুন দাম হয়েছে ১১৩.৫১ টাকা। লিটার প্রতি ২.৮০ টাকা বেড়ে ডিজ়েলের দাম কলকাতায় হয়েছে ৯৯.৮২ টাকা।
পেট্রল এবং ডিজ়েলের দাম গত ১৫ মে থেকে বাড়তে শুরু করেছে। ১০ দিনে টানা চার বার বেড়ে গেল জ্বালানির দাম। চলতি মাসেই আরও বাড়তে পারে কি না, তা নিয়ে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বিভিন্ন রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২১ সালের পর থেকেই জ্বালানির দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে যেতে শুরু করে। ২০১৪ সালে যেখানে পেট্রোলের গড় দাম ছিল প্রায় ৭১ টাকা, সেখানে ২০২২ সালে তা পৌঁছে যায় প্রায় ৯৭ টাকার কাছাকাছি। ডিজেলের ক্ষেত্রেও একই ছবি দেখা যায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম, টাকার দুর্বল হওয়া, কেন্দ্রীয় আবগারি শুল্ক এবং রাজ্যের ভ্যাট— সব মিলিয়েই সাধারণ মানুষকে বেশি দাম দিতে হচ্ছে।
সংসদে পেশ হওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ সালে পেট্রোলের উপর কেন্দ্রীয় আবগারি শুল্ক ছিল লিটার প্রতি ৯.৪৮ টাকা এবং ডিজেলের উপর ৩.৫৬ টাকা। ২০২০ সালে সেই শুল্ক বেড়ে যথাক্রমে ৩২.৯৮ টাকা ও ৩১.৮৩ টাকায় পৌঁছায়। যদিও পরে কিছুটা কমানো হয়, তবুও জ্বালানির উপর কর এখনও সাধারণ মানুষের বড় বোঝা হয়ে রয়েছে।
২০২০ সালে করোনা পরিস্থিতির সময় আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যাপকভাবে কমে গিয়েছিল। কিন্তু সেই সুবিধা পুরোপুরি সাধারণ মানুষ পাননি বলেই অভিযোগ ওঠে। বিভিন্ন অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ এবং সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া ডেটায় দেখা যায়, সেই সময় কেন্দ্রীয় সরকার কর বাড়িয়ে রাজস্ব আয় বাড়িয়েছিল। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলেও দেশের পাম্পে পেট্রোল-ডিজেলের দাম তুলনামূলকভাবে বেশি থেকেই যায়।
সম্প্রতি পশ্চিম এশিয়ার অস্থিরতা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে আবারও দেশে জ্বালানির দাম বেড়েছে। মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই একাধিকবার মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। এর ফলে পরিবহণ খরচ থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দামেও চাপ পড়ার আশঙ্কা বাড়ছে।
বিরোধীদের অভিযোগ, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলে সাধারণ মানুষকে তার সুবিধা দেওয়া হয় না, কিন্তু দাম বাড়লেই দ্রুত সেই চাপ জনগণের উপর চাপিয়ে দেওয়া হয়। অন্যদিকে সরকারের দাবি, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি এবং আমদানি নির্ভরতার কারণেই এই মূল্যবৃদ্ধি এড়ানো সম্ভব হচ্ছে না। তবে রাজনৈতিক তরজা যাই হোক, বাস্তবে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়ছেন সাধারণ মানুষই।