২১ দিনেই বাংলায় “ডাবল ইঞ্জিন” না “ডাবল টেনশন”?

৪ঠা মে- এর পর কী কী পরিবর্তন এল রাজ্যে? তারই ঝলক তুলে ধরার চেষ্টা করা হল এই প্রতিবেদনে।

২১ দিনেই বাংলায় “ডাবল ইঞ্জিন” না “ডাবল টেনশন”?

মধুরিমা সেনগুপ্ত, কলকাতা : ৪ঠা মে ফল প্রকাশের পর পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক আবহটা যেন হঠাৎ করেই বদলে যেতে শুরু করে। মাত্র তিন সপ্তাহের মধ্যেই রাজ্যের নানা প্রান্তে এমন কিছু ঘটনা সামনে আসে, যা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে যেমন আলোচনা বেড়েছে, তেমনই তৈরি হয়েছে বিতর্কও।

সবচেয়ে বেশি চর্চায় আসে হকার উচ্ছেদ ও বুলডোজার অভিযান। শিয়ালদহ থেকে শুরু করে একাধিক এলাকায় দোকান, ঝুপড়ি ও রাস্তার ধারের হকারদের উচ্ছেদ নিয়ে উত্তেজনা তৈরি হয়। বহু জায়গায় অভিযোগ ওঠে, পুনর্বাসনের স্পষ্ট পরিকল্পনা ছাড়াই উচ্ছেদ অভিযান চালানো হচ্ছে। পশ্চিম বর্ধমান ও রেলের জমি লাগোয়া এলাকায় বুলডোজার নিয়ে ভাঙচুরের ঘটনাও খবরের শিরোনামে আসে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত রিপোর্টে দেখা যায়, বহু পরিবার রাতারাতি অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। 

শুধু উচ্ছেদ নয়, ভোট পরবর্তী রাজনৈতিক উত্তেজনাও দ্রুত বেড়েছে। বিভিন্ন এলাকায় দলীয় কার্যালয় দখল, পতাকা নামানো, সংঘর্ষ এবং রাজনৈতিক কর্মীদের উপর হামলার অভিযোগ সামনে আসে। কয়েকটি ঘটনার তদন্তে SIT গঠনের উল্লেখ করা হয়। ফলে “পরিবর্তন” নিয়ে মানুষের মধ্যে যে আশা ছিল, তার পাশাপাশি ভয় ও অনিশ্চয়তার কথাও শোনা যেতে শুরু করেছে। 

এর মধ্যেই আরেকটি বড় বিতর্ক তৈরি হয় সরকারি কর্মচারীদের নিয়ে জারি হওয়া নতুন নির্দেশিকা ঘিরে। নির্দেশিকায় বলা হয়, সরকারের অনুমতি ছাড়া কোনও সরকারি কর্মচারী সংবাদমাধ্যমে কথা বলতে পারবেন না বা প্রশাসনিক নথি প্রকাশ করতে পারবেন না। সরকারি নীতির বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে সমালোচনা থেকেও বিরত থাকতে বলা হয়। বিরোধীরা একে “কণ্ঠরোধের চেষ্টা” বলে আক্রমণ শুরু করে। সরকারি মহলেও বিষয়টি নিয়ে চাপা অস্বস্তি তৈরি হয়েছে বলে বিভিন্ন রিপোর্টে উঠে আসে। 

অন্যদিকে, নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলিও নতুন করে আলোচনায় আসে। সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি, সপ্তম বেতন কমিশন, নিয়োগ প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করার মতো প্রতিশ্রুতি নিয়ে মানুষের প্রত্যাশা অনেক বেড়েছিল। বিজেপির তরফে আগে দাবি করা হয়েছিল, সরকার গঠন হলে দ্রুত শূন্যপদে নিয়োগ ও বেতন কাঠামোয় বড় পরিবর্তন আনা হবে। কিন্তু সরকার গঠনের পর সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন নিয়ে ইতিমধ্যেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। 

সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পরও আগের সরকারের কিছু জনপ্রিয় প্রকল্প পুরোপুরি বন্ধ করা হয়নি। বরং কিছু ক্ষেত্রে নতুন নামে চালিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত মিলেছে। মহিলাদের আর্থিক সহায়তা প্রকল্প নিয়ে নতুন শর্ত আরোপ করা হলেও, প্রকল্প বন্ধ করার পথে সরকার হাঁটেনি। এতে রাজনৈতিক মহলে নতুন বিতর্ক শুরু হয়েছে— বিরোধিতার সময় যেগুলোকে “দান-খয়রাতি” বলা হত, ক্ষমতায় এসে সেই মডেলই কি বজায় রাখতে হচ্ছে? 

এই কয়েক সপ্তাহে একটা বিষয় স্পষ্ট হয়েছে— পশ্চিমবঙ্গে সরকার বদলের সঙ্গে সঙ্গে প্রশাসনিক ভাষা, রাজনৈতিক আচরণ এবং রাস্তাঘাটের পরিবেশ অনেকটাই বদলেছে। কেউ বলছেন “কঠোর প্রশাসন” শুরু হয়েছে, কেউ বলছেন “ভয়ের পরিবেশ” তৈরি হচ্ছে। তবে এটুকু নিশ্চিত, ৪ঠা মে-র পর বাংলার রাজনীতি আর আগের জায়গায় নেই।