যুদ্ধের কাউন্টডাউন শুরু? ভারত-পাক উত্তেজনায় কাঁপছে দক্ষিণ এশিয়া!
ভারতের বিদেশ মন্ত্রক সম্প্রতি চীন ও পাকিস্তানের যৌথ বিবৃতির তীব্র বিরোধিতা করেছে। বেজিং ও ইসলামাবাদ একসাথে কাশ্মীর প্রসঙ্গ তোলার পর দিল্লি স্পষ্ট ভাষায় জানায়, জম্মু-কাশ্মীর ও লাদাখ ভারতের “অবিচ্ছেদ্য অংশ” এবং এই বিষয়ে তৃতীয় পক্ষের মন্তব্য ভারত মেনে নেবে না।
মধুরিমা সেনগুপ্ত, কলকাতা : মে মাস শেষ হতে চলেছে, কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক আবহাওয়া যেন ক্রমশ আরও গরম হয়ে উঠছে। ভারত ও পাকিস্তানের সম্পর্ক নতুন করে এমন এক জায়গায় পৌঁছেছে, যেখানে প্রকাশ্যে যুদ্ধ না হলেও “যুদ্ধের প্রস্তুতি” শব্দটা এখন আর অতিরঞ্জিত শোনায় না। সীমান্তে গুলিবিনিময়, কাশ্মীর নিয়ে কূটনৈতিক সংঘাত, চীন-পাকিস্তান জোটের নতুন বার্তা, জল চুক্তি নিয়ে উত্তেজনা— সব মিলিয়ে উপমহাদেশ আবার সেই পুরনো অস্বস্তিকর প্রশ্নের সামনে দাঁড়িয়ে: ভারত-পাকিস্তান কি আবার বড় সংঘর্ষের দিকে যাচ্ছে?
গত কয়েক সপ্তাহে পরিস্থিতি দ্রুত বদলেছে। ভারতের বিদেশ মন্ত্রক সম্প্রতি চীন ও পাকিস্তানের যৌথ বিবৃতির তীব্র বিরোধিতা করেছে। বেজিং ও ইসলামাবাদ একসাথে কাশ্মীর প্রসঙ্গ তোলার পর দিল্লি স্পষ্ট ভাষায় জানায়, জম্মু-কাশ্মীর ও লাদাখ ভারতের “অবিচ্ছেদ্য অংশ” এবং এই বিষয়ে তৃতীয় পক্ষের মন্তব্য ভারত মেনে নেবে না। একইসঙ্গে ভারত আবারও CPEC প্রকল্পকে “অবৈধ” বলে উল্লেখ করেছে, কারণ সেই করিডোর পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরের উপর দিয়ে গেছে।
এই কূটনৈতিক সংঘাত হঠাৎ করে তৈরি হয়নি। ২০২৫ সালে কাশ্মীরের পহেলগাঁও হামলার পর দুই দেশের মধ্যে যে সামরিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল, তার প্রভাব এখনো পুরোপুরি কাটেনি। সেই হামলায় ২৬ জন নিহত হওয়ার পর ভারত পাকিস্তান-ভিত্তিক জঙ্গি সংগঠনগুলিকে দায়ী করে। এরপর সীমান্তে উত্তেজনা বাড়তে বাড়তে দুই দেশ সরাসরি সামরিক হামলা পর্যন্ত চালায়। ভারত “অপারেশন সিঁদুর” নামে পাকিস্তানের একাধিক জায়গায় হামলা চালায়, আর পাকিস্তান পাল্টা “অপারেশন বুনিয়ান-উল-মারসুস” শুরু করে। কয়েকদিনের মধ্যে পরিস্থিতি এতটাই খারাপ হয়ে যায় যে আন্তর্জাতিক মহলে পারমাণবিক যুদ্ধের আশঙ্কাও তৈরি হয়েছিল। পরে আমেরিকা, সৌদি আরব ও অন্যান্য দেশের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি হয়।
কিন্তু যুদ্ধবিরতির পরেও বিশ্বাস ফেরেনি। বরং দুই দেশের রাজনৈতিক ভাষা আরও আক্রমণাত্মক হয়েছে। পাকিস্তান এখনো দাবি করে যে তারা ভারতের বিরুদ্ধে “কৌশলগত সাফল্য” পেয়েছে, অন্যদিকে ভারত স্পষ্ট করে দিয়েছে ভবিষ্যতে বড় কোনো জঙ্গি হামলাকে তারা “যুদ্ধ” হিসেবেই দেখবে।
এই মুহূর্তে সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হল— কাশ্মীর ইস্যুর সঙ্গে এখন আরও গভীরভাবে জড়িয়ে পড়ছে চীন। বেজিং শুধু পাকিস্তানের কূটনৈতিক অবস্থানকে সমর্থনই করছে না, বরং CPEC ও সামরিক সহযোগিতাকেও নতুন করে জোর দিচ্ছে। এর অর্থ হল, ভারতের সামনে এখন শুধু পাকিস্তান নয়, এক ধরনের “দুই-মুখী কৌশলগত চাপ” তৈরি হচ্ছে। ভারতের সেনাপ্রধানও সম্প্রতি ইঙ্গিত দিয়েছেন যে “two-front threat” এখনও বাস্তব।
অন্যদিকে পাকিস্তানের অবস্থাও খুব স্থিতিশীল নয়। আফগানিস্তান সীমান্তে তালিবান ও পাকিস্তানের মধ্যে সংঘর্ষ বেড়েছে। বালোচিস্তান ও খাইবার পাখতুনখোয়ায় হামলা বাড়ছে। পাকিস্তানের সেনাবাহিনী একদিকে ভারতের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান দেখাতে চাইছে, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংকটও সামলাতে হচ্ছে। ফলে ভারতের সঙ্গে উত্তেজনা পাকিস্তানের রাজনীতিতে “জাতীয় ঐক্যের” হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহার হচ্ছে।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল জল রাজনীতি। সিন্ধু জল চুক্তি দীর্ঘদিন ধরে দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধের মাঝেও টিকে ছিল। কিন্তু পহেলগাঁও হামলার পর ভারত সেই চুক্তি স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নেয় এবং চেনাব নদীর জল নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নতুন পদক্ষেপ শুরু করে। পাকিস্তানে এই বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুতর নিরাপত্তা ইস্যু হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ পাকিস্তানের কৃষি ও জলব্যবস্থা অনেকটাই এই নদীগুলির উপর নির্ভরশীল।
এখন প্রশ্ন হল— সত্যিই কি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের সম্ভাবনা আছে?
বাস্তবতা হল, ১৯৯৯ সালের কার্গিল যুদ্ধের পর থেকে ভারত ও পাকিস্তান দু’দেশই বুঝে গেছে যে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের অর্থ হবে অর্থনৈতিক বিপর্যয়। দুই দেশই পারমাণবিক শক্তিধর। ফলে বড় যুদ্ধ শুরু হলে সেটি কোথায় গিয়ে থামবে, তা কেউ জানে না। সেই কারণেই আন্তর্জাতিক শক্তিগুলো প্রতিবারই দ্রুত হস্তক্ষেপ করে। ২০২৫ সালের সংঘাতেও আমেরিকা, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরশাহী ও ব্রিটেন সক্রিয়ভাবে মধ্যস্থতা করেছিল।
তবে এটাও সত্যি যে এখনকার সংঘাত আর পুরনো ধরনের যুদ্ধ নয়। ড্রোন, সাইবার হামলা, সীমান্তে ছোট আকারের আক্রমণ, কূটনৈতিক চাপ, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা— এই “হাইব্রিড ওয়ারফেয়ার” এখন নতুন বাস্তবতা। ২০২৫ সালের সংঘাতে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে প্রথম বড় ড্রোন যুদ্ধও দেখা গিয়েছিল।
যদিও প্রকাশ্যে দুই দেশই কঠোর ভাষা ব্যবহার করছে, কিন্তু ব্যাকচ্যানেল যোগাযোগ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। কারণ দিল্লি ও ইসলামাবাদ দু’পক্ষই জানে— আরেকটি বড় যুদ্ধ শুধু সীমান্ত নয়, পুরো দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতি ও স্থিতিশীলতাকে ধ্বংস করে দিতে পারে।
আজকের পরিস্থিতি তাই এক অদ্ভুত দ্বন্দ্বের। একদিকে যুদ্ধের আবহ, সেনা প্রস্তুতি, কূটনৈতিক সংঘর্ষ। অন্যদিকে যুদ্ধ এড়ানোর মরিয়া আন্তর্জাতিক চেষ্টা। ভারত ও পাকিস্তান হয়তো আগামীকাল পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে জড়াবে না, কিন্তু “স্থায়ী উত্তেজনা” এখন দুই দেশের সম্পর্কের নতুন স্বাভাবিক বাস্তবতা হয়ে উঠছে। দক্ষিণ এশিয়ার মানুষ আবার সেই পুরনো আশঙ্কার মধ্যেই বাঁচছে— শান্তি আছে, কিন্তু সেটা কতদিনের জন্য, কেউ জানে না।