আধার-ব্যাঙ্ক নয়, এবার চাই জমি-গাড়ির হিসাবও! অন্নপূর্ণা যোজনার ফর্মে কী আছে?

অন্নপূর্ণা যোজনার ক্ষেত্রে শুধু আধার কার্ড ও ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট থাকলেই হবে না। আবেদনকারীদের পরিচয়পত্র, রেশন কার্ড, ব্যাঙ্কের নথি, পরিবারের তথ্য, আয়ের বিবরণ এবং অনেক ক্ষেত্রে সম্পত্তি সংক্রান্ত নথিও প্রস্তুত রাখতে হতে পারে। তাই আবেদন করার আগে সমস্ত প্রয়োজনীয় নথি সংগ্রহ করে রাখা গুরুত্বপূর্ণ।

আধার-ব্যাঙ্ক নয়, এবার চাই জমি-গাড়ির হিসাবও! অন্নপূর্ণা যোজনার ফর্মে কী আছে?

মধুরিমা সেনগুপ্ত, কলকাতা : পশ্চিমবঙ্গে নতুন বিজেপি সরকারের ঘোষিত অন্নপূর্ণা যোজনা এখন রাজ্যের অন্যতম আলোচিত প্রকল্প। নির্বাচনের আগে মহিলাদের প্রতি মাসে ৩,০০০ টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। সরকার ক্ষমতায় আসার পর সেই প্রকল্পের আবেদন প্রক্রিয়া শুরু হতেই সামনে আসে একটি দীর্ঘ ১২ পাতার ফর্ম, যা নিয়ে রাজনৈতিক মহল থেকে সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে।

আগে বিভিন্ন ভাতা প্রকল্পে সাধারণত আধার কার্ড, ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট এবং কিছু প্রয়োজনীয় তথ্য দিলেই আবেদন করা যেত। কিন্তু অন্নপূর্ণা যোজনার ক্ষেত্রে বিষয়টি অনেক বেশি বিস্তারিত। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এবার আবেদনকারীর শুধু ব্যক্তিগত তথ্য নয়, পুরো পরিবারের আর্থিক ও সামাজিক অবস্থার তথ্য সংগ্রহের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। সরকারের দাবি, এর মাধ্যমে প্রকৃত উপভোক্তাদের চিহ্নিত করা সহজ হবে এবং ভুয়ো বা ডুপ্লিকেট সুবিধাভোগীদের বাদ দেওয়া সম্ভব হবে।

ফর্মের শুরুতেই আবেদনকারীর নাম, ঠিকানা, বয়স, বৈবাহিক অবস্থা, মোবাইল নম্বর, আধার নম্বর, ভোটার কার্ড নম্বর এবং রেশন কার্ডের তথ্য দিতে হচ্ছে। এরপরই আসছে পরিবারের বিস্তারিত তথ্যের অংশ। পরিবারের প্রতিটি সদস্যের নাম, বয়স, আবেদনকারীর সঙ্গে সম্পর্ক, শিক্ষাগত যোগ্যতা, পেশা এবং পরিচয়পত্র সংক্রান্ত তথ্য চাওয়া হচ্ছে বলে জানা গিয়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই পরিবারের উপার্জনকারী সদস্যের পেশা ও আয়ের উৎস সম্পর্কেও বিস্তারিত তথ্য দিতে বলা হচ্ছে।

সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে পরিবারের আর্থিক অবস্থার ওপর। ফর্মে পরিবারের মোট মাসিক ও বার্ষিক আয়ের হিসাব জানতে চাওয়া হচ্ছে। চাকরি, ব্যবসা, কৃষিকাজ, পেনশন বা অন্য কোনো উৎস থেকে আয় হলে তার উল্লেখ করতে হচ্ছে। এছাড়া পরিবারের কেউ আয়কর রিটার্ন জমা দেন কি না, প্যান কার্ড আছে কি না, সেসব তথ্যও চাওয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে সরকার উচ্চ আয়ের পরিবারগুলিকে প্রকল্পের আওতার বাইরে রাখতে চাইছে বলে মনে করা হচ্ছে।

অন্নপূর্ণা যোজনার টাকা সরাসরি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে পাঠানো হবে বলে ব্যাঙ্ক সংক্রান্ত তথ্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আবেদনকারীর ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট নম্বর, আইএফএসসি কোড, শাখার নাম, আধারের সঙ্গে অ্যাকাউন্ট সংযুক্ত রয়েছে কি না এবং ডিবিটি সক্রিয় আছে কি না, সেসব তথ্য দিতে হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে ব্যাঙ্ক পাসবুকের কপিও জমা দিতে হতে পারে।

ফর্মের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হল সম্পত্তি সংক্রান্ত তথ্য। আবেদনকারীর পরিবারের নিজস্ব বাড়ি রয়েছে কি না, জমি রয়েছে কি না, জমির পরিমাণ কত, খতিয়ান বা জমির নথি আছে কি না, সেসব তথ্যও চাওয়া হচ্ছে বলে বিভিন্ন রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি পরিবারের কারও মোটরসাইকেল, চারচাকা গাড়ি বা অন্য কোনো যানবাহন থাকলে তার তথ্যও দিতে হতে পারে।

কিছু ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যবিমা সম্পর্কিত তথ্যও চাওয়া হচ্ছে। পরিবার সরকারি বা বেসরকারি কোনো স্বাস্থ্যবিমা প্রকল্পের সুবিধা পাচ্ছে কি না, সেই বিষয়েও প্রশ্ন রাখা হয়েছে বলে আবেদনকারীদের একাংশ দাবি করেছেন। সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পের অন্যান্য সুবিধা পাওয়া হচ্ছে কি না, সেটাও যাচাই করা হতে পারে।

এই দীর্ঘ ফর্ম নিয়েই সবচেয়ে বেশি বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত রিপোর্ট অনুযায়ী, বহু মহিলা বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকার আবেদনকারীরা এত বিস্তারিত তথ্য একা পূরণ করতে সমস্যায় পড়তে পারেন।ফলে অনেক ক্ষেত্রেই অন্যের সাহায্য নিতে হতে পারে, যা ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে।

অন্যদিকে সরকারের বক্তব্য, অতীতে বিভিন্ন ভাতা প্রকল্পে বহু ভুয়ো নাম, মৃত ব্যক্তির নামে সুবিধা গ্রহণ এবং ডুপ্লিকেট উপভোক্তার অভিযোগ সামনে এসেছিল। সেই কারণেই এবার পরিবারের আর্থিক ও সামাজিক তথ্য বিস্তারিতভাবে সংগ্রহ করা হচ্ছে। সরকারের দাবি, এই যাচাই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রকৃত দরিদ্র ও যোগ্য মহিলাদের কাছে প্রকল্পের সুবিধা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে।

তবে একটি বিষয় পরিষ্কার, অন্নপূর্ণা যোজনার ক্ষেত্রে শুধু আধার কার্ড ও ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট থাকলেই হবে না। আবেদনকারীদের পরিচয়পত্র, রেশন কার্ড, ব্যাঙ্কের নথি, পরিবারের তথ্য, আয়ের বিবরণ এবং অনেক ক্ষেত্রে সম্পত্তি সংক্রান্ত নথিও প্রস্তুত রাখতে হতে পারে। তাই আবেদন করার আগে সমস্ত প্রয়োজনীয় নথি সংগ্রহ করে রাখা গুরুত্বপূর্ণ।