"খেলা হবে" থেকে "জেল হবে"! একে একে জেলে তৃণমূলের দাপুটে নেতা-মন্ত্রীরা
সাম্প্রতিক সময়ে প্রাক্তন উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন মন্ত্রী ও দিনহাটার বর্ষীয়ান নেতা উদয়ন গুহ এবং উত্তর ২৪ পরগনার প্রভাবশালী তৃণমূল নেতা শাহানুর মণ্ডল-এর গ্রেফতারি রাজ্যের রাজনৈতিক সমীকরণে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
মধুরিমা সেনগুপ্ত, কলকাতা : পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে আবারও চর্চার কেন্দ্রবিন্দুতে তৃণমূল কংগ্রেস। রাজ্যে ক্ষমতার পালাবদলের পর একের পর এক প্রভাবশালী তৃণমূল নেতার বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ এবং গ্রেফতারির ঘটনায় সরগরম রাজনৈতিক মহল। সাম্প্রতিক সময়ে প্রাক্তন উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন মন্ত্রী ও দিনহাটার বর্ষীয়ান নেতা উদয়ন গুহ এবং উত্তর ২৪ পরগনার প্রভাবশালী তৃণমূল নেতা শাহানুর মণ্ডল-এর গ্রেফতারি রাজ্যের রাজনৈতিক সমীকরণে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
প্রাক্তন মন্ত্রী উদয়ন গুহকে একটি প্রতারণা মামলায় গ্রেফতার করেছে কোচবিহার জেলা পুলিশ। পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, তাঁর বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরেই একটি আর্থিক প্রতারণা সংক্রান্ত মামলা চলছিল এবং সেই মামলায় গ্রেফতারি পরোয়ানাও জারি ছিল। তদন্তকারীদের কাছে নির্দিষ্ট তথ্য ছিল যে উদয়ন গুহ তাঁর দিনহাটার বাড়িতে না থেকে কলকাতার ফুলবাগান এলাকার একটি আবাসনে অবস্থান করছেন। সেই তথ্যের ভিত্তিতেই কোচবিহার জেলা পুলিশের একটি দল কলকাতায় এসে অভিযানে নামে। পরে ওই ফ্ল্যাট থেকে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। রাজনৈতিক মহলে এই ঘটনাকে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে, কারণ দীর্ঘদিন ধরে উত্তরবঙ্গের তৃণমূল রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুখ ছিলেন তিনি।
অন্যদিকে, বসিরহাট থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে উত্তর ২৪ পরগনা জেলা পরিষদের প্রাক্তন খাদ্য কর্মাধ্যক্ষ শাহানুর মণ্ডলকে। দীর্ঘদিন ধরেই তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক গুরুতর অভিযোগ উঠছিল। অভিযোগের তালিকায় রয়েছে ভোট-পরবর্তী হিংসায় মদত, জোরপূর্বক জমি ও সম্পত্তি দখল, স্থানীয় ব্যবসায়ীদের ওপর প্রভাব খাটানো এবং সীমান্তবর্তী এলাকায় গরু পাচার চক্রের সঙ্গে যোগ থাকার অভিযোগ। তদন্তকারী সংস্থার দাবি, বেশ কিছু অভিযোগের ভিত্তিতে প্রাথমিক তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে আসার পরই তাঁর বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
শাহানুর মণ্ডলের গ্রেফতারি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা। কারণ বসিরহাট এবং সংলগ্ন সীমান্ত এলাকায় তিনি দীর্ঘদিন ধরে সংগঠনের শক্তিশালী মুখ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলির অনেকটাই স্থানীয় মানুষের কাছ থেকে বারবার সামনে এসেছিল বলে জানা যায়। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি বহুদিন ধরেই তাঁর বিরুদ্ধে কঠোর তদন্তের দাবি জানিয়ে আসছিল।
এই দুই গ্রেফতারির পর রাজ্যের রাজনৈতিক মহলে নতুন করে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে, তৃণমূলের একাংশের বিরুদ্ধে যে দুর্নীতি, প্রভাব খাটানো এবং বেআইনি কার্যকলাপের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে উঠছিল, সেগুলির তদন্ত কি এবার আরও গতি পেতে চলেছে? বিরোধীরা দাবি করছে, এটি কেবল শুরু। অন্যদিকে তৃণমূলের একাংশের বক্তব্য, আইন আইনের পথে চলবে এবং অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত কাউকে দোষী বলা যায় না।
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ক্ষমতার পরিবর্তনের পর প্রশাসনিক ও তদন্তকারী সংস্থাগুলির সক্রিয়তা বেড়েছে বলেই বহু পুরনো অভিযোগ নতুন করে সামনে আসছে। ফলে আগামী দিনে আরও কয়েকজন প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের বিরুদ্ধে তদন্ত বা আইনি পদক্ষেপের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
উদয়ন গুহ এবং শাহানুর মণ্ডলের গ্রেফতারি তাই শুধুমাত্র দুটি পৃথক আইনি ঘটনা নয়, বরং পশ্চিমবঙ্গের পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতির একটি বড় ইঙ্গিত বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল। আগামী দিনে এই মামলাগুলির তদন্ত কোন দিকে এগোয় এবং তার রাজনৈতিক প্রভাব কতটা গভীর হয়, সেদিকেই এখন নজর রাজ্যবাসীর।