বিধানসভায় ওবিসি সংশোধনী বিল পাস, কিন্তু আসল চর্চা 'ঋতব্রত - তৃণমূল'-এর ওয়াকআউট নিয়েই!
সোমবার পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার অধিবেশন যেন একেবারে রাজনৈতিক নাটকের মঞ্চে পরিণত হয়েছিল। আলোচনার কেন্দ্রে ছিল ওবিসি সংরক্ষণ সংক্রান্ত জোড়া সংশোধনী বিল। কিন্তু শুধু বিল নয়, তার থেকেও বেশি নজর কেড়েছে ভোটাভুটির আগে ও পরে ঘটে যাওয়া একের পর এক নাটকীয় ঘটনা।
মধুরিমা সেনগুপ্ত, কলকাতা : সোমবার পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার অধিবেশন যেন একেবারে রাজনৈতিক নাটকের মঞ্চে পরিণত হয়েছিল। আলোচনার কেন্দ্রে ছিল ওবিসি সংরক্ষণ সংক্রান্ত জোড়া সংশোধনী বিল। কিন্তু শুধু বিল নয়, তার থেকেও বেশি নজর কেড়েছে ভোটাভুটির আগে ও পরে ঘটে যাওয়া একের পর এক নাটকীয় ঘটনা। ওয়াকআউট, বিধায়কদের মধ্যে মতভেদ, স্পিকারের ভর্ৎসনা—সব মিলিয়ে রাজনৈতিক বার্তা ছিল স্পষ্ট, ওবিসি সংরক্ষণ ইস্যু আগামী দিনে আরও বড় বিতর্কের জন্ম দিতে চলেছে।
সোমবার বিধানসভায় রাজ্যের অনগ্রসর শ্রেণিকল্যাণমন্ত্রী গৌরীশঙ্কর ঘোষ দুটি সংশোধনী বিল পেশ করেন। একটি ‘ওয়েস্ট বেঙ্গল ব্যাকওয়ার্ড ক্লাসেস (আদার দ্যান শিডিউল কাস্ট অ্যান্ড শিডিউল ট্রাইব) রিজার্ভেশন অফ ভ্যাকান্সিস ইন সার্ভিসেস অ্যান্ড পোস্ট অ্যামেন্ডমেন্ট বিল, ২০২৬’ এবং অন্যটি ‘দ্য ওয়েস্ট বেঙ্গল কমিশন ফর ব্যাকওয়ার্ড ক্লাসেস (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল, ২০২৬’। প্রথমে মনে করা হয়েছিল ধ্বনিভোটেই বিল পাস হয়ে যাবে। কিন্তু ISF বিধায়ক নওশাদ সিদ্দিকী ভোটাভুটির দাবি জানান। স্পিকার রথীন্দ্র বসু সেই আবেদন মঞ্জুর করায় পরিস্থিতি নতুন মোড় নেয়।
ভোটাভুটির ফলাফল ছিল স্পষ্ট। বিলের পক্ষে ভোট পড়ে ১৮৬টি, বিপক্ষে ১৭টি এবং ভোটদানে বিরত থাকেন ছয়জন বিধায়ক। সংখ্যার বিচারে বিল সহজেই পাস হলেও রাজনৈতিক দিক থেকে দিনের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ছিল ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল শিবিরের ওয়াকআউট।
ভোটাভুটির আগে ওই শিবিরের অধিকাংশ বিধায়ক অধিবেশন কক্ষ ছেড়ে বেরিয়ে যান। তবে সবাই সময়মতো বেরোতে পারেননি। পরে স্পিকারের অনুমতি নিয়ে তাঁদের বেরিয়ে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। এই ঘটনায় অসন্তোষ প্রকাশ করে স্পিকার সংশ্লিষ্ট বিধায়কদের ভর্ৎসনাও করেন। কিন্তু এখানেই শেষ নয়। ঋতব্রত শিবিরের ছয়জন বিধায়ক শেষ পর্যন্ত কক্ষত্যাগ করেননি। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য বাইরন বিশ্বাস, মোশারফ হোসেন, কাজল শেখ এবং তৌফিকুর রহমান। তাঁরা মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলে নিজেদের আসনে বসেন। বিল পাস হওয়ার পরে আবার অধিবেশন কক্ষেও ফিরে আসেন। ফলে একই রাজনৈতিক শিবিরের ভিতরেই ভিন্ন অবস্থান স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
দমদমের বিজেপি বিধায়ক অরিজিৎ বক্সীর বলেন, আগের তৃণমূল সরকার ভোটব্যাঙ্কের রাজনীতির স্বার্থে ওবিসি তালিকা তৈরি করেছিল। তাঁর দাবি, এই তালিকা তৈরির পিছনে প্রকৃত সামাজিক ও শিক্ষাগত অনগ্রসরতার বদলে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য কাজ করেছে। অন্যদিকে বিলের বিরোধিতা করে বক্তব্য রাখেন জয়নগরের বিধায়ক বিশ্বনাথ দাস।
এই সংশোধনী বিলের মাধ্যমে ২০১২ সালের ওবিসি সংক্রান্ত আইনে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়েছে। আগে ক্যাটেগরি ‘এ’-তে ৬৫টি এবং ক্যাটেগরি ‘বি’-তে ৭৮টি জনগোষ্ঠীর তালিকা আইনের মধ্যেই যুক্ত ছিল। নতুন বিলে সেই তালিকাকে আইন থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। পরিবর্তে ভবিষ্যতে কোন গোষ্ঠী ওবিসি তালিকায় থাকবে বা বাদ পড়বে, সেই বিষয়ে সুপারিশ করবে অনগ্রসর শ্রেণি কমিশন। কমিশনের সঙ্গে আলোচনা করেই সরকার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।
শুধু তাই নয়, নতুন আইনে সাধারণ নাগরিকদেরও আবেদন জানানোর সুযোগ রাখা হয়েছে। কোনও সম্প্রদায়কে ওবিসি তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা, বাদ দেওয়া, অতিরিক্ত অন্তর্ভুক্তি বা কম অন্তর্ভুক্তির অভিযোগ কমিশনের কাছে জানানো যাবে। কমিশন বিষয়টি খতিয়ে দেখে সরকারের কাছে সুপারিশ করবে এবং সেই সুপারিশই কার্যকর হবে।
সংরক্ষণের হার নিয়েও নতুন বিলে গুরুত্বপূর্ণ বিধান রাখা হয়েছে। কমিশনের সঙ্গে আলোচনা করে রাজ্য সরকার সময়ে সময়ে ওবিসি সংরক্ষণের হার নির্ধারণ করতে পারবে। তবে মোট সংরক্ষণ ৫০ শতাংশের সীমা অতিক্রম করতে পারবে না। পাশাপাশি অনগ্রসরতার মাত্রা অনুযায়ী ওবিসি সম্প্রদায়গুলিকে বিভিন্ন শ্রেণিতে ভাগ করার ক্ষমতাও সরকারের হাতে থাকছে, যদিও তা কমিশনের পরামর্শের ভিত্তিতেই হবে।
ওবিসি সংরক্ষণ নিয়ে পশ্চিমবঙ্গে বিতর্ক নতুন নয়। বামফ্রন্ট সরকারের আমলে রঙ্গনাথ মিশ্র কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে এই সংরক্ষণ ব্যবস্থা চালু হয়েছিল। পরে ২০১২ সালে তৃণমূল সরকার সেই আইনে সংশোধন এনে নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর তালিকা আইনের সঙ্গে যুক্ত করে। এবার সেই ব্যবস্থাতেই বড় পরিবর্তন আনল বর্তমান সরকার।
সংখ্যার হিসাবে বিল পাস হওয়া হয়তো সহজ ছিল, কিন্তু সোমবারের বিধানসভা দেখিয়ে দিল, ওবিসি সংরক্ষণ শুধুমাত্র একটি প্রশাসনিক বিষয় নয়, এটি এখন রাজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ইস্যু। ভোটাভুটি, ওয়াকআউট, মতভেদ এবং শেষ মুহূর্তের নাটকীয় ঘটনাগুলি আগামী দিনের রাজনীতিতেও যে বড় প্রভাব ফেলতে পারে, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে ইতিমধ্যেই জোর আলোচনা শুরু হয়েছে।