“ভয় আউট, ককরোচ ইন!” — বিজেপির চেয়েও বেশি ফলোয়ার আরশোলা জনতা পার্টির

ভারতের ডিজিটাল রাজনৈতিক পরিসরে হঠাৎ করেই এক নতুন নাম আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে— “Cockroach জনতা পার্টি” বা সংক্ষেপে CJP।

“ভয় আউট, ককরোচ ইন!” — বিজেপির চেয়েও বেশি ফলোয়ার আরশোলা জনতা পার্টির

মধুরিমা সেনগুপ্ত, কলকাতা : ভারতের ডিজিটাল রাজনৈতিক পরিসরে হঠাৎ করেই এক নতুন নাম আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে— “Cockroach জনতা পার্টি” বা সংক্ষেপে CJP। এটি কোনো স্বীকৃত রাজনৈতিক দল নয়, বরং একটি ব্যঙ্গাত্মক  ডিজিটাল আন্দোলন, যা মূলত সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মের ক্ষোভ, হতাশা এবং রাজনৈতিক ব্যঙ্গকে সামনে এনে ভাইরাল হয়ে উঠেছে। 

এই আন্দোলনের সূচনা হয় ২০২৬ সালের মে মাসে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের রিপোর্ট অনুযায়ী, সুপ্রিম কোর্টে এক শুনানির সময় প্রধান বিচারপতির  যুব সমাজ, RTI অ্যাক্টিভিস্ট এবং সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাক্টিভিজম নিয়ে করা একটি মন্তব্যকে কেন্দ্র করে সোশ্যাল মিডিয়ায় তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। সেই বিতর্কিত মন্তব্যে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি যুবসমাজকে 'আরশোলা' বা প্যারাসাইটের সাথে তুলনা করে। এরপরেই বহু তরুণ সেটিকেই ব্যঙ্গাত্মকভাবে নিজেদের পরিচয়ে পরিণত করে। এই প্রেক্ষাপটে ডিজিটাল কনটেন্ট নির্মাতা ও প্রাক্তন AAP সোশ্যাল মিডিয়া ভলান্টিয়ার অভিজিৎ দিপকে “Cockroach জনতা পার্টি” নামের একটি parody movement শুরু করেন। 

অভিজিৎ দিপকে সম্পর্কে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে যে তিনি আগে আম আদমি পার্টির সোশ্যাল মিডিয়া টিমের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে Public Relations নিয়ে পড়াশোনা করছেন। যদিও তিনি দাবি করেছেন যে CJP কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের প্রকল্প নয়, বরং যুবসমাজের ক্ষোভ ও হতাশার ডিজিটাল বহিঃপ্রকাশ। তার পুরনো পোস্ট এবং AAP নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ ঘিরে বিতর্কও তৈরি হয়েছে। 

Cockroach জনতা পার্টির জনপ্রিয়তার মূল কারণ ছিল তাদের কনটেন্ট স্টাইল। ইনস্টাগ্রামে মিম, reels, ব্যঙ্গাত্মক manifesto, নকল রাজনৈতিক প্রচার এবং “যুবদের দল” ধরনের স্লোগান খুব দ্রুত ভাইরাল হয়ে যায়। তাদের নিজেদের পরিচয় ছিল — “A political front of the youth, by the youth, for the youth।” এই ভাষা এবং meme culture-এর মিশ্রণ Gen Z ব্যবহারকারীদের মধ্যে দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। 

ফলোয়ারের দিক থেকে CJP-এর উত্থান ছিল অভাবনীয়। ১৯ মে পর্যন্ত যেখানে এই পেজের ফলোয়ার ছিল কয়েক লক্ষ, সেখানে ২১ মে অর্থাৎ আজকের দিনে দাঁড়িয়ে দেখা যাচ্ছে তাদের ইনস্টাগ্রাম ফলোয়ার প্রায় ১৪ মিলিয়নের বেশি। আশ্চর্যের বিষয় হলেও সত্যি যে, ককরোচ জনতা পার্টির ফলোয়ার BJP-র অফিসিয়াল ইনস্টাগ্রাম হ্যান্ডেলের ফলোয়ার সংখ্যাকেও ছাড়িয়ে গেছে। এটি স্পষ্ট যে ভারতের ডিজিটাল রাজনৈতিক ইতিহাসে এত দ্রুত কোনো মুভমেন্টের উত্থান আগে খুব কম দেখা গেছে। 

শুধু সাধারণ তরুণরাই নয়, বহু পরিচিত ব্যক্তিত্বও এই আন্দোলনের প্রতি আগ্রহ দেখিয়েছেন। বিভিন্ন রিপোর্ট অনুযায়ী চলচ্চিত্র পরিচালক অনুরাগ কাশ্যপ, অভিনেত্রী  কঙ্কনা সেন শর্মা, কমেডিয়ান কুণাল কামরা-সহ একাধিক সেলিব্রিটি এই পেজকে ফলো বা সমর্থন করেছেন। 

তবে এই জনপ্রিয়তার সঙ্গে সঙ্গে বিতর্কও বেড়েছে। সমালোচকদের একাংশের দাবি, এটি শুধুমাত্র “meme activism” বা আবেগনির্ভর অনলাইন রাজনীতি, যার বাস্তব রাজনৈতিক রূপরেখা নেই। Reddit এবং অন্যান্য সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন— এই আন্দোলনের বাস্তব উদ্দেশ্য কী, এটি আদৌ স্বাধীন নাকি কোনো রাজনৈতিক দলের পরোক্ষ সমর্থন রয়েছে। কেউ কেউ আবার এটিকে যুবসমাজের ক্ষোভের প্রকৃত বহিঃপ্রকাশ বলেও দেখছেন। 

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, Cockroach জনতা পার্টি মূলত ভারতের নতুন “meme politics” সংস্কৃতির প্রতীক। এটি দেখিয়েছে যে সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে ব্যঙ্গ, meme শুধুমাত্র বিনোদন নয়, রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া এবং গণআবেগ তৈরির শক্তিশালী মাধ্যমেও পরিণত হতে পারে। 

সব মিলিয়ে Cockroach জনতা পার্টি এখনো পর্যন্ত মূলত একটি ডিজিটাল আন্দোলন হিসেবেই পরিচিত। এটি বাস্তব রাজনৈতিক দলে রূপ নেবে কি না, বা কয়েক সপ্তাহ পরেই হারিয়ে যাবে কি না, তা এখনই বলা কঠিন। তবে এটা নিশ্চিত যে ভারতের তরুণ প্রজন্মের একাংশের ক্ষোভ, হতাশা এবং রাজনৈতিক ব্যঙ্গকে সোশ্যাল মিডিয়ায় সংগঠিত করার ক্ষেত্রে CJP একটি বড় উদাহরণ হয়ে উঠেছে।