যুবসমাজকে আরশোলা মন্তব্যে ঝড়, এবার সামনে এলো বিচারপতির পুরনো ‘কালো ইতিহাস'

বিচারপতি থাকাকালীনই তাঁর বিরুদ্ধে প্রথম বড় অভিযোগ ওঠে ২০১২ সালে। চণ্ডীগড়ের রিয়েল-এস্টেট ব্যবসায়ী সতীশ কুমার জৈন তৎকালীন প্রধান বিচারপতি এস এইচ কাপাডিয়া-র কাছে লিখিত অভিযোগ করেন যে সূর্য কান্ত একাধিক সম্পত্তি লেনদেনে প্রকৃত মূল্য গোপন করেছেন এবং কোটি টাকার নগদ লেনদেনের মাধ্যমে কর ও স্ট্যাম্প ডিউটি ফাঁকি দিয়েছেন।

যুবসমাজকে আরশোলা মন্তব্যে ঝড়, এবার সামনে এলো বিচারপতির পুরনো ‘কালো ইতিহাস'

মধুরিমা সেনগুপ্ত, কলকাতা : সাম্প্রতিক এক মন্তব্যে ভারতের যুবসমাজকে “আরশোলা” বলার অভিযোগ ঘিরে বিতর্কের কেন্দ্রে উঠে এসেছেন সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি সূর্যকান্ত। সেই বিতর্কের মাঝেই নতুন করে সামনে আসছে তাঁর অতীতকে ঘিরে একাধিক পুরনো অভিযোগ, যেগুলি বহু বছর ধরেই বিচারবিভাগের অন্দরে বিতর্কের বিষয় হয়ে রয়েছে। অভিযোগগুলির মধ্যে রয়েছে কর ফাঁকি, সম্পত্তির প্রকৃত মূল্য গোপন করা, বেনামি সম্পত্তি লেনদেন এবং জামিন পাইয়ে দেওয়ার বিনিময়ে ঘুষ নেওয়ার মতো গুরুতর বিষয়।

সূর্য কান্ত ১৯৮৪ সালে হরিয়ানার হিসারে আইনজীবী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরে তিনি হরিয়ানার অ্যাডভোকেট জেনারেল হন এবং ২০০৪ সালে পাঞ্জাব ও হরিয়ানা হাইকোর্টের বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পান। কিন্তু বিচারপতি থাকাকালীনই তাঁর বিরুদ্ধে প্রথম বড় অভিযোগ ওঠে ২০১২ সালে। চণ্ডীগড়ের রিয়েল-এস্টেট ব্যবসায়ী সতীশ কুমার জৈন তৎকালীন প্রধান বিচারপতি এস এইচ কাপাডিয়া-র কাছে লিখিত অভিযোগ করেন যে সূর্য কান্ত একাধিক সম্পত্তি লেনদেনে প্রকৃত মূল্য গোপন করেছেন এবং কোটি টাকার নগদ লেনদেনের মাধ্যমে কর ও স্ট্যাম্প ডিউটি ফাঁকি দিয়েছেন।

অভিযোগ অনুযায়ী, কুমারহাট্টির একটি ফার্মহাউসের প্রকৃত বিক্রয়মূল্য ছিল প্রায় ₹২.৩২ কোটি, অথচ দলিলে দেখানো হয় মাত্র ₹১৩ লক্ষ। একইভাবে পঞ্চকুলার একটি প্লটের প্রকৃত মূল্য ₹৩.১০ কোটি হলেও নথিতে লেখা হয় ₹১.৫০ কোটি। দিল্লির গ্রেটার কৈলাশ-I এলাকায় একটি বাড়ির ক্ষেত্রেও অভিযোগ ওঠে যে ₹৩.৫০ কোটির সম্পত্তি মাত্র ₹১.৫০ কোটিতে দেখানো হয়েছিল এবং বাকি টাকা নগদে দেওয়া হয়। চণ্ডীগড়ের আরও একটি সম্পত্তি নিয়ে দলিলে অসঙ্গতির অভিযোগও সামনে আসে।

সতীশ জৈন আরও দাবি করেন, বিচারপতির সরকারি বাসভবন, সেক্টর ১৬-র বাড়ি এবং পঞ্চকুলার ফার্মহাউস সংস্কারের জন্য তিনি প্রায় ₹১৯ লক্ষ খরচ করেছিলেন, কিন্তু দীর্ঘদিন পর্যন্ত কোনো অর্থ পাননি। পরে সুপ্রিম কোর্টে অভিযোগ করার পর নাকি তাঁকে মাত্র ₹৬ লক্ষ ফেরত দেওয়া হয়।

এই অভিযোগগুলির সঙ্গে সরকারি সার্কেল রেটের তুলনাও বিতর্ক বাড়ায়। অভিযোগকারীর বক্তব্য ছিল, প্রকৃত বাজারমূল্য ইচ্ছাকৃতভাবে কম দেখিয়ে কর ফাঁকি দেওয়া হয়েছে। তিনি সরাসরি অভিযোগ করেন যে বিচারপতি “বারবার কর ফাঁকি, স্ট্যাম্প ডিউটি এড়ানো ও বেনামি সম্পত্তি রাখার” সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

এর পাঁচ বছর পরে, ২০১৭ সালে, পাটিয়ালার উচ্চ-নিরাপত্তাযুক্ত কারাগারে বন্দি সুরজিত সিং আরও গুরুতর অভিযোগ আনেন। তাঁর দাবি ছিল, এনডিপিএস বা মাদক মামলায় জামিন পাইয়ে দেওয়ার জন্য ঘুষ নেওয়া হতো এবং বিচারপতির ঘনিষ্ঠ আত্মীয় ও কয়েকজন আইনজীবী মধ্যস্থতাকারীর কাজ করতেন। ২০১৫ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে আটটি মামলার উল্লেখ করে তিনি অভিযোগ করেন যে বাণিজ্যিক পরিমাণ মাদক উদ্ধার হওয়ার পরও অভিযুক্তদের জামিন দেওয়া হয়েছিল। 

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ওঠে এই কারণে যে, এত গুরুতর অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও কোনো স্বাধীন তদন্ত হয়নি। সূর্য কান্ত পাঞ্জাব ও হরিয়ানা হাইকোর্টে বিচারপতি হিসেবেই বহাল থাকেন এবং ২০১৮ সালে তাঁকে হিমাচল প্রদেশ হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি করা হয়। সেই পদোন্নতিও বিতর্কের বাইরে ছিল না। কারণ তাঁর চেয়ে চার বছর সিনিয়র বিচারপতি A. K. Mittal-কে উপেক্ষা করা হয়েছিল।

তৎকালীন সুপ্রিম কোর্ট বিচারপতি A. K. Goel কোলেজিয়ামের সিদ্ধান্তের সরাসরি বিরোধিতা করেছিলেন। ২০১৮ সালের ১২ জানুয়ারির এক চিঠিতে তিনি লেখেন যে সূর্য কান্তের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলির পূর্ণাঙ্গ তদন্ত না হওয়া পর্যন্ত তাঁকে প্রধান বিচারপতি করার কোনো যুক্তি নেই। তিনি এমনও উল্লেখ করেন যে অভিযোগে থাকা আটটি জামিনের আদেশ “প্রথম দৃষ্টিতে অস্বাভাবিক এবং আইনি দিক থেকে দুর্বল” বলে মনে হয়েছে।

তবুও শেষ পর্যন্ত তাঁর উন্নীতকরণ আটকায়নি। প্রায় নয় মাস ধরে কেন্দ্র সরকার ফাইল আটকে রাখার পর ৩ অক্টোবর ২০১৮, যেদিন রঞ্জন গোগোই প্রধান বিচারপতি হিসেবে শপথ নেন, সেদিনই আইন মন্ত্রক সূর্য কান্তকে হিমাচল প্রদেশ হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি জারি করে। কেন সেই দীর্ঘ বিলম্ব হয়েছিল এবং পরে কী পরিবর্তন ঘটেছিল, সেই প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর আজও সামনে আসেনি।

ভারতের বিচারব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে বহুদিন ধরেই বিতর্ক রয়েছে। সূর্য কান্তকে ঘিরে ওঠা এই অভিযোগগুলি সেই বিতর্ককে আবার সামনে এনে দিয়েছে। কারণ অভিযোগের সত্যতা আদালতে প্রমাণিত না হলেও, এত গুরুতর প্রশ্ন ওঠার পরও কোনো স্বাধীন তদন্ত না হওয়া বিচারব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়েই নতুন করে প্রশ্ন তুলছে।