JSSC-CGL বাতিল করল হেমন্ত সরকার! আন্দোলনকারীদের জয়, নাকি শুরু হল নতুন সংকট?

২৪ দিনের টানা আন্দোলন, অনশন ও চাকরিপ্রার্থীদের লাগাতার চাপের পর বড় সিদ্ধান্ত ঝাড়খণ্ড সরকারের। বাতিল করা হল JSSC-CGL 2024 পরীক্ষা। পাশাপাশি TDPL-এর মাধ্যমে ২০১৪ সাল থেকে নেওয়া একাধিক নিয়োগ পরীক্ষা, ফলাফল ও সংশ্লিষ্ট নিয়োগ নিয়েও বড় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

JSSC-CGL বাতিল করল হেমন্ত সরকার! আন্দোলনকারীদের জয়, নাকি শুরু হল নতুন সংকট?

মধুরিমা সেনগুপ্ত, কলকাতা: ২৪ দিনের টানা আন্দোলন, অনশন, স্লোগান আর চাকরিপ্রার্থীদের লাগাতার চাপ—শেষ পর্যন্ত বড় সিদ্ধান্ত নিল ঝাড়খণ্ডের হেমন্ত সোরেন সরকার। বাতিল করা হল JSSC-CGL 2024 পরীক্ষা। শুধু এই পরীক্ষাই নয়, বেসরকারি সংস্থা TSR Data Processing Pvt Ltd (TDPL)-এর মাধ্যমে ২০১৪ সাল থেকে নেওয়া অন্যান্য নিয়োগ পরীক্ষা, ফলাফল ও সংশ্লিষ্ট নিয়োগও বাতিল করার সিদ্ধান্ত জানিয়েছে সরকার।

রাঁচির জয়পাল সিং মুন্ডা স্টেডিয়ামে আন্দোলনরত চাকরিপ্রার্থীদের কাছে সোমবার, ১৭ অগস্ট রাতে এই খবর পৌঁছতেই শুরু হয় উচ্ছ্বাস। ২৪ দিনের আন্দোলনের পর ছাত্রনেতা দেবেন্দ্র নাথ মাহাতো-সহ আন্দোলনকারীদের একাংশ এটিকে বড় জয় হিসেবে দেখছেন। দেবেন্দ্র মাহাতো তাঁর ১৬ দিনের অনশনও শেষ করেন।

কেন এতদিন ধরে আন্দোলন?

JSSC-CGL পরীক্ষা ঘিরে বিতর্ক অবশ্য নতুন নয়। ২০২৩ সালের নিয়োগ পরীক্ষা প্রথমে ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে হয়েছিল। প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ ওঠার পর সেই পরীক্ষা বাতিল করে পরে ২১ ও ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৪ নতুন করে পরীক্ষা নেওয়া হয়। প্রায় ৬.৪০ লক্ষ প্রার্থী এই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় আবেদন করেছিলেন।

পরবর্তী সময়ে পরীক্ষার স্বচ্ছতা ও প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ নিয়ে মামলা গড়ায় ঝাড়খণ্ড হাইকোর্টে। আদালতের নথিতে দেখা যায়, তদন্তে পরীক্ষার্থীদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে প্রশ্নপত্র ও উত্তর দেওয়ার নামে প্রতারণার যথেষ্ট প্রমাণ পাওয়ার কথা বলা হলেও, সংগঠিতভাবে পুরো প্রশ্নপত্র ফাঁসের নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বিষয়টি নিয়ে তদন্তও চলেছে।

এই দীর্ঘ বিতর্কের মধ্যেই চলতি বছরের জুলাই থেকে JPSC-JSSC নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ তুলে আন্দোলন শুরু করেন চাকরিপ্রার্থীরা। ধীরে ধীরে সেই আন্দোলন বড় আকার নেয়। আন্দোলনকারীদের অন্যতম প্রধান দাবি ছিল JSSC-CGL বাতিল এবং পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষ তদন্ত।

সরকারের সিদ্ধান্ত ঠিক কী?

১৭ অগস্ট মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেনের নেতৃত্বে দীর্ঘ বিশেষ ক্যাবিনেট বৈঠকের পর সরকার জানায়, JSSC-CGL পরীক্ষা বাতিল করা হচ্ছে। পাশাপাশি TDPL-এর মাধ্যমে ২০১৪ সাল থেকে পরিচালিত নিয়োগ পরীক্ষাগুলির ক্ষেত্রেও বড় পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে—পরীক্ষা, ফলাফল এবং সংশ্লিষ্ট নির্বাচন/নিয়োগ বাতিলের সিদ্ধান্ত জানানো হয়েছে।

এর পাশাপাশি ২০১৪ সাল থেকে রাজ্যে হওয়া প্রতিযোগিতামূলক নিয়োগ পরীক্ষাগুলিতে সম্ভাব্য অনিয়ম খতিয়ে দেখার সিদ্ধান্ত হয়েছে। পরীক্ষার পদ্ধতিতে সংস্কারের জন্য সিনিয়র IAS আধিকারিক অমিতাভ কৌশলের নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠনের কথাও জানানো হয়েছে।

হেমন্ত সোরেনের বক্তব্য অনুযায়ী, পরীক্ষায় নির্ধারিত SOP বা Standard Operating Procedure যথাযথভাবে মেনে চলা হলে এই ধরনের সমস্যা তৈরি হওয়ার সুযোগ কমত। তাই শুধু একটি পরীক্ষা নয়, গোটা নিয়োগ ব্যবস্থাকে খতিয়ে দেখার বার্তা দিয়েছে সরকার।

তাহলে কি আন্দোলন শেষ?

এখানেই রয়েছে বড় প্রশ্ন।
JSSC-CGL বাতিল হওয়াকে আন্দোলনকারীদের একটি বড় দাবি পূরণ হিসেবে দেখা হলেও CBI তদন্তের দাবি এখনও পূরণ হয়নি। আন্দোলনকারী ছাত্রদের একাংশ স্পষ্ট জানিয়েছেন, শুধু পরীক্ষা বাতিল করলেই তাঁরা পুরো আন্দোলন প্রত্যাহার করছেন না। তাঁদের দাবি, নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগের তদন্ত কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা CBI-এর হাতে দিতে হবে।

অর্থাৎ, সরকারের সিদ্ধান্তে আন্দোলনে বড় সাফল্য এলেও বিতর্ক পুরোপুরি শেষ হয়নি।

যাঁরা পরীক্ষায় পাশ করেছিলেন, তাঁদের কী হবে?

সরকারের সিদ্ধান্তের পর নতুন করে সমস্যায় পড়েছেন সেইসব পরীক্ষার্থী, যাঁরা JSSC-CGL পরীক্ষায় সফল হয়ে নিয়োগের অপেক্ষায় ছিলেন বা ইতিমধ্যেই নিয়োগ পেয়েছিলেন। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের রিপোর্ট অনুযায়ী, প্রায় ২,০০০ সফল প্রার্থীর ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। তাঁদের বক্তব্য, যদি পরীক্ষায় অনিয়ম হয়ে থাকে, তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক; কিন্তু পুরো পরীক্ষা বাতিল হলে নির্দোষ সফল প্রার্থীরাও ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।

রাজনৈতিক চাপও কম নয়

ছাত্র আন্দোলনের পাশাপাশি এই ইস্যুতে বিরোধী দলগুলিও সরকারকে নিশানা করেছে। বিজেপি-সহ বিরোধীদের তরফে CBI তদন্তের দাবি জোরালো করা হয়েছে। JDU-র নেতা রাজীব রঞ্জনও বলেছেন, শুধু পরীক্ষা বাতিল করলেই হবে না, তদন্ত কেন্দ্রীয় সংস্থার হাতে দেওয়া উচিত।

এখন নজর কোথায়?

এই মুহূর্তে ঝাড়খণ্ডের চাকরিপ্রার্থীদের নজর তিনটি বিষয়ে—নতুন JSSC-CGL পরীক্ষা কবে হবে, বাতিল হওয়া অন্যান্য নিয়োগের ভবিষ্যৎ কী এবং অভিযোগের তদন্ত শেষ পর্যন্ত কোন সংস্থা করবে।

২৪ দিনের আন্দোলনের পর পরীক্ষা বাতিলের সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে ঝাড়খণ্ডের ছাত্র আন্দোলনের বড় সাফল্য। কিন্তু একই সঙ্গে প্রায় দুই হাজার সফল প্রার্থীর ভবিষ্যৎ এবং CBI তদন্তের দাবি নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। তাই JSSC-CGL বাতিল হওয়া আন্দোলনের শেষ নয়, বরং ঝাড়খণ্ডের নিয়োগ ব্যবস্থাকে ঘিরে নতুন অধ্যায়ের শুরু