পুজোর খাবারেও কি রাজনীতি? বাঙালির মাছ-মাংস নিয়ে BJP-তেই কেন দুই সুর?

দুর্গাপুজোয় মাছ-মাংস খাওয়া নিয়ে বিতর্ক তুঙ্গে। বাগেশ্বর ধামের ধীরেন্দ্র কৃষ্ণ শাস্ত্রীর আমিষ বর্জনের আহ্বানের পর বিজেপির নেতাদের পাল্টা বক্তব্য। জানুন বিতর্কের নেপথ্যের সম্পূর্ণ ঘটনা।

পুজোর খাবারেও কি রাজনীতি? বাঙালির মাছ-মাংস নিয়ে BJP-তেই কেন দুই সুর?

মধুরিমা সেনগুপ্ত, কলকাতা : বাঙালির পাতে কী থাকবে, সেটাও কি এবার ঠিক করে দেবে রাজনীতি? দুর্গাপুজোর আগে মাছ-মাংস খাওয়া নিয়ে বিতর্কের আঁচ আরও বাড়ল। বাগেশ্বর ধামের প্রধান ধীরেন্দ্র কৃষ্ণ শাস্ত্রীর ‘আমিষ বর্জন’-এর আহ্বানের পর এবার সরাসরি তার বিরোধিতা করলেন বঙ্গ BJP সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য। তাঁর স্পষ্ট বক্তব্য—বাঙালি কী খাবে, তা কোনও সাধু, নেতা বা রাজনৈতিক দল ঠিক করে দিতে পারে না।

দুর্গাপুজো যত এগিয়ে আসছে, ততই বাংলায় পুজোর আয়োজনের পাশাপাশি সামনে আসছে খাবার, সংস্কৃতি এবং ধর্মীয় রীতিনীতি নিয়ে বিতর্ক। এর মধ্যেই মাছ-মাংস খাওয়া নিয়ে তৈরি হওয়া এই বিতর্ক নতুন মাত্রা পেয়েছে, যখন বঙ্গ BJP-র শীর্ষ নেতৃত্বের পক্ষ থেকে প্রকাশ্যে ভিন্ন অবস্থান সামনে এল।

কী বলেছিলেন বাগেশ্বর বাবা?

সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গে ধর্মীয় অনুষ্ঠানে এসে বাগেশ্বর ধামের ধীরেন্দ্র কৃষ্ণ শাস্ত্রী দুর্গাপুজোর সময়ে আমিষ খাবার এড়িয়ে চলার আবেদন করেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, দুর্গাপুজো ও সংশ্লিষ্ট ধর্মীয় আয়োজনের সময় প্যান্ডেলের আশপাশে মাছ-মাংস না রাখা এবং আমিষ খাবার থেকে বিরত থাকা উচিত। এমনকি পুজোর সময়ে আমিষ খাওয়া ব্যক্তিদের ‘পাখণ্ডী’ বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

এর আগেই বিশ্ব হিন্দু পরিষদও দুর্গাপুজোর প্যান্ডেলের কাছে আমিষ খাবার না রাখার বিষয়ে একটি পরামর্শ দিয়েছিল। তবে VHP স্পষ্ট করেছিল, তারা রাজ্যজুড়ে আমিষ খাবার নিষিদ্ধ করার দাবি করছে না।

কী বললেন বঙ্গ BJP সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য?

এই বিতর্কের মধ্যেই মুখ খুলেছেন পশ্চিমবঙ্গ BJP সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য। তিনি কার্যত বাগেশ্বর বাবার বক্তব্য থেকে দলের অবস্থানকে আলাদা করে দিয়েছেন।

শমীক ভট্টাচার্যের বক্তব্য, মানুষ কী খাবেন বা কী পরবেন, তা তাঁদের ব্যক্তিগত পছন্দ। কোনও ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব বা রাজনৈতিক দল সেই সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে পারে না। তিনি বাংলার নিজস্ব খাদ্যসংস্কৃতির কথাও তুলে ধরেছেন।

তিনি আরও বলেন, বাঙালির খাদ্যাভ্যাসে মাছ ও মাংসের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য রয়েছে। দুর্গাপুজোর সময়ও বাংলার বিভিন্ন পরিবারে প্রচলিত খাবারের রীতির সঙ্গে আমিষ খাবারের সম্পর্ক রয়েছে। তাঁর বক্তব্যে অষ্টমীতে লুচি-পুরি এবং নবমীতে কচি পাঁঠার মাংস খাওয়ার প্রচলনের কথাও উঠে আসে।

‘বাঙালির পাতে মাছ-মাংস থাকবে না?’—দলের অন্দরেও কি একই সুর?

শমীকের বক্তব্যের পর আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে এসেছে। রাজ্যের মন্ত্রী দিলীপ ঘোষও বাংলার ধর্মীয় সংস্কৃতিতে আমিষের উপস্থিতির কথা তুলে ধরেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, কালীপুজো ও অন্যান্য ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে বহুদিন ধরেই পশুবলির প্রথা রয়েছে এবং সেই মাংস প্রসাদ হিসেবে গ্রহণের রীতিও প্রচলিত। দুর্গাপুজোর নবমীতেও কিছু ক্ষেত্রে এই ধরনের প্রথা রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

অন্যদিকে অর্থনীতিবিদ সঞ্জীব সান্যালও সামাজিক মাধ্যমে বিতর্কে নিজের মত জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্যে শাক্ত হিন্দু ঐতিহ্যের সঙ্গে মাংসের ঐতিহাসিক সম্পর্কের প্রসঙ্গ উঠে এসেছে এবং নবমী-দশমীর প্রসাদের সঙ্গে আমিষের সম্পর্কের কথাও তিনি উল্লেখ করেছেন।

তাহলে কি পুজোয় আমিষ নিষিদ্ধ হচ্ছে?

না। এখনও পর্যন্ত এমন কোনও সরকারি সিদ্ধান্ত নেই যে পশ্চিমবঙ্গে দুর্গাপুজোর সময় সাধারণভাবে মাছ-মাংস খাওয়া বা বিক্রি নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

এখানে দুটি বিষয় আলাদা করে দেখা জরুরি। একদিকে রয়েছে ধীরেন্দ্র শাস্ত্রী বা কোনও সংগঠনের ধর্মীয় আবেদন বা পরামর্শ; অন্যদিকে রয়েছে সরকারের আনুষ্ঠানিক নির্দেশ। বর্তমান বিতর্কটি মূলত প্রথম বিষয়টিকে ঘিরে।

রাজ্য সরকারের ঘোষিত দুর্গাপুজোর নিয়মের মধ্যে অবশ্য মহাষ্টমীর দিন মদ বিক্রি বন্ধ রাখা এবং পুজোয় DJ ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা-র মতো সিদ্ধান্ত রয়েছে। রেড রোডের বার্ষিক দুর্গাপুজো কার্নিভালও এ বছর হচ্ছে না। কিন্তু এগুলির সঙ্গে রাজ্যজুড়ে মাছ-মাংস নিষিদ্ধ করার কোনও ঘোষণা এক জিনিস নয়।

কেন এত বড় বিতর্ক?

কারণ বাংলায় দুর্গাপুজো শুধুমাত্র ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, এটি দীর্ঘদিনের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উৎসব। পুজোর সঙ্গে খাবারেরও একটি নিজস্ব সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। একদিকে যেমন বহু পরিবার পুজোর নির্দিষ্ট দিনগুলিতে নিরামিষ খাবার খান, অন্যদিকে বহু বাঙালি পরিবারে পুজোর সময় মাছ বা মাংসও রান্না হয়।

তাই বাইরে থেকে কোনও নির্দিষ্ট খাদ্যাভ্যাসকে বাংলার উপর চাপিয়ে দেওয়ার প্রশ্ন উঠলেই তা শুধুমাত্র ‘নিরামিষ বনাম আমিষ’ বিতর্কে আটকে থাকে না। সামনে আসে ব্যক্তিগত স্বাধীনতা, ধর্মীয় রীতি, আঞ্চলিক সংস্কৃতি এবং রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রশ্নও।

দুর্গাপুজো সামনে। ফলে আগামী দিনে এই বিতর্ক আরও বাড়বে কি না, সেটাই এখন দেখার। বিশেষ করে পুজোর সময় আমিষ খাবার নিয়ে কোনও নতুন সংগঠন, রাজনৈতিক দল বা ধর্মীয় ব্যক্তিত্বের বক্তব্য আসে কি না, সেদিকেও নজর থাকবে।

অর্থাৎ, পুজোর আগে প্রশ্নটা এখন শুধু ‘মাছ-মাংস খাব কি খাব না’ নয়—প্রশ্ন উঠছে, বাঙালির সংস্কৃতি ও ব্যক্তিগত পছন্দের সীমা ঠিক করবে কে?