বুথ ছেড়ে লাঞ্চে ব্যস্ত ভোট কর্মীরা! প্রথম দফার ভোটে হামলা ও অনিয়মের অভিযোগে চাপে গণতন্ত্র

২৩শে এপ্রিল ২০২৬ প্রথম দফার ভোটে একদিকে ব্যাপক ভোটার উপস্থিতি, অন্যদিকে রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় সংঘর্ষ, হামলা ও অনিয়মের অভিযোগে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে নির্বাচন। বিস্তারিত বিশ্লেষণ জানুন।

বুথ ছেড়ে লাঞ্চে ব্যস্ত ভোট কর্মীরা! প্রথম দফার ভোটে হামলা ও অনিয়মের অভিযোগে চাপে গণতন্ত্র

মধুরিমা সেনগুপ্ত, কলকাতা : ২৩শে এপ্রিল ২০২৬—পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের প্রথম দফা ছিল গণতন্ত্রের এক গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। রাজ্যের বহু জেলায় ভোটগ্রহণ হয়, এবং বিপুল সংখ্যক ভোটার বুথে পৌঁছে তাদের মত প্রকাশ করেন। ভোটদানের হার ছিল উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি, যা নাগরিকদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণের ইচ্ছাকে স্পষ্ট করে। কিন্তু এই ইতিবাচক চিত্রের পাশাপাশি একাধিক জায়গায় অশান্তি, সংঘর্ষ, হামলা এবং অনিয়মের অভিযোগ সামনে আসে, যা গোটা নির্বাচন প্রক্রিয়াকে বিতর্কের মুখে দাঁড় করায়।

সবচেয়ে বেশি উত্তেজনার খবর আসে মুর্শিদাবাদ জেলা থেকে। নওদা এলাকায় ভোট চলাকালীন পোলিং বুথের আশেপাশে কাঁচা বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, তৃণমূল কংগ্রেস এবং হুমায়ুন কবিরের দলীয় কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ বাধে। পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে, পাথর ছোঁড়া এবং মারামারির ঘটনাও ঘটে। ফলে কিছুক্ষণের জন্য ভোটগ্রহণও ব্যাহত হয়। প্রশাসনকে অতিরিক্ত বাহিনী মোতায়েন করতে হয়, যাতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা যায়।

দক্ষিণ দিনাজপুরের কুমারগঞ্জ থেকেও এক চাঞ্চল্যকর ঘটনা সামনে আসে। বিজেপি প্রার্থী শুভেন্দু সরকারকে ভোটের দিন তাড়া করে নিয়ে গিয়ে মারধরের অভিযোগ ওঠে। এই ঘটনার ভিডিও দ্রুত সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে, যা বিষয়টিকে আরও গুরুতর করে তোলে। একজন প্রার্থী, যিনি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অংশ, তার ওপর এভাবে হামলা হওয়া নির্বাচনী পরিবেশের নিরাপত্তা নিয়ে বড় প্রশ্ন তোলে।

আসানসোলেও ভোটের দিন অশান্তির ছবি দেখা যায়। বিজেপি প্রার্থী অগ্নিমিত্র পলের গাড়িতে হামলা চালানো হয় বলে অভিযোগ ওঠে। তার গাড়িতে পাথর ছোঁড়া হয়, যার ফলে গাড়ির কাঁচ ভেঙে যায়। এই ঘটনায় তার সহকারীরাও আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। যদিও প্রতিপক্ষ দল এই অভিযোগ অস্বীকার করে।

মালদার চাঁচল এলাকায়ও ভোটকে কেন্দ্র করে সমস্যা তৈরি হয়। বিজেপি প্রার্থী রতন দাসের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয় যে তাদের পোলিং এজেন্টকে মারধর করা হয়েছে এবং বহু ভোটারকে বুথে যেতে বাধা দেওয়া হয়েছে। এই ধরনের অভিযোগ নতুন নয়, কিন্তু ভোটের দিন এমন ঘটনা ঘটলে তা সরাসরি ভোটাধিকার প্রয়োগে প্রভাব ফেলে এবং নির্বাচন ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলে।

এছাড়াও বিভিন্ন জায়গায় প্রার্থী এবং তাদের কনভয়ের ওপর হামলার খবরও সামনে আসে। বিশেষ করে হুমায়ুন কবিরের কনভয়ে ভাঙচুরের অভিযোগ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। এই ধরনের ঘটনা থেকে বোঝা যায় যে শুধু সাধারণ ভোটার নয়, প্রার্থীরাও অনেক ক্ষেত্রে নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে ছিলেন।

শিলিগুড়ি মালদহ বেশ কিছু জায়গায় ভোটারদের ভয় দেখানো, জাল ভোট বা প্রক্সি ভোটিংয়ের অভিযোগ উঠে আসে। অনেক ভোটার দাবি করেন যে তাদের বুথে যেতে বাধা দেওয়া হয়েছে বা তাদের হয়ে অন্য কেউ ভোট দিয়ে দিয়েছে। এত সংখ্যক অভিযোগ একসাথে উঠে আসা নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।

সব থেকে অভাবনীয় এক ঘটনা দেখা গেছে পিংলা বিধানসভায়। পিংলা বিধানসভায় ৯ নম্বর বুথে দেখা গেছে সব ভোট কর্মীরা দুপুর বেলা বুথ ছেড়ে লাঞ্চ করতে চলে গেছে, এবং তাদেরকে যখন নিরাপত্তা রক্ষিরা ফোন করে, তখন তারা উত্তর দেয় যে তারা বাইরে আছে তারা পড়ে আসছে। এতটা উদাসীন!

পুরুলিয়া জেলায় আবার অন্য ধরনের সমস্যা দেখা যায়। সেখানে EVM খারাপ হওয়ার অভিযোগ ঘিরে উত্তেজনা তৈরি হয়। ভোটাররা ক্ষুব্ধ হয়ে পড়েন এবং কেন্দ্রীয় বাহিনীর সঙ্গে বচসা ও সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে। প্রযুক্তিগত ত্রুটি নির্বাচন প্রক্রিয়ার অংশ হতে পারে, কিন্তু তা যদি সময়মতো সমাধান না হয়, তাহলে তা সহজেই বড় অশান্তির রূপ নিতে পারে—এই ঘটনাই তার প্রমাণ।

সব মিলিয়ে প্রথম দফার ভোটের চিত্র ছিল দ্বৈত। একদিকে বিপুল ভোটার উপস্থিতি এবং গণতান্ত্রিক উৎসবের আবহ, অন্যদিকে বিচ্ছিন্ন হলেও গুরুতর কিছু হিংসার ঘটনা, যা এই উৎসবকে ম্লান করে দেয়। অনেক জায়গায় শান্তিপূর্ণভাবে ভোট সম্পন্ন হলেও কিছু স্পর্শকাতর এলাকায় ঘটে যাওয়া এই ঘটনাগুলি রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা, প্রশাসনিক প্রস্তুতি এবং নির্বাচন ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।