ওষুধের ভায়াল, হাতে ইঞ্জেকশনের দাগ… NRS-এ রুপালির শেষ কয়েক মিনিটে কী ঘটেছিল?

NRS Hospital Nurse Death: এনআরএস হাসপাতালের স্ত্রীরোগ বিভাগের শৌচালয় থেকে উদ্ধার নার্স রুপালি বর্মনের দেহ। পাশে ফেন্টানিলের ভায়াল ও হাতে ইঞ্জেকশনের দাগ ঘিরে রহস্য। প্রাথমিক ময়নাতদন্তে অতিরিক্ত ওষুধ প্রয়োগের সম্ভাবনা, তদন্তে ৮ সদস্যের কমিটি। আত্মহত্যা নাকি অন্য কোনও কারণ—চূড়ান্ত রিপোর্টের অপেক্ষা।

ওষুধের ভায়াল, হাতে ইঞ্জেকশনের দাগ… NRS-এ রুপালির শেষ কয়েক মিনিটে কী ঘটেছিল?

মধুরিমা সেনগুপ্ত, কলকাতা : রাতের ডিউটিতে ছিলেন তিনি। ওয়ার্ডে রোগীদের পরিষেবা দেওয়ার পর হঠাৎই চলে গেলেন শৌচালয়ে। কয়েক মিনিট পরেও আর ফিরলেন না। দরজা ভেঙে ভিতরে ঢুকতেই দেখা গেল, মেঝেতে অচৈতন্য অবস্থায় পড়ে রয়েছেন কর্তব্যরত নার্স। পাশে মোবাইল, মিলল ওষুধের ভায়ালও। শেষ পর্যন্ত বাঁচানো গেল না ৩০ বছরের রুপালি বর্মনকে।

নীলরতন সরকার মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের স্ত্রীরোগ বিভাগের এই ঘটনাকে ঘিরে এখন একাধিক প্রশ্ন। আত্মহত্যা, দুর্ঘটনা, নাকি এর পিছনে অন্য কোনও কারণ রয়েছে—প্রাথমিক তদন্তের পরেও নিশ্চিত উত্তর মেলেনি। তবে আজ, ১৪ অগস্ট, প্রাথমিক ময়নাতদন্তের রিপোর্ট এবং স্বাস্থ্য দফতরের তদন্তে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে এসেছে।

ঠিক কী ঘটেছিল বুধবার রাতে?

রুপালি বর্মন বুধবার রাতে NRS হাসপাতালের স্ত্রীরোগ বিভাগের HDU-তে নাইট ডিউটিতে ছিলেন। রাত ৮টা নাগাদ তিনি কাজে যোগ দেন এবং রোগীদের প্রাথমিক পরিষেবাও দেন। এরপর রাত ১০টা ২০ মিনিট নাগাদ তিনি HDU-সংলগ্ন শৌচালয়ে যান।

কিছুক্ষণ পরেও রুপালি নার্সিং স্টেশনে ফিরে না আসায় সহকর্মীদের সন্দেহ হয়। রাত ১০টা ২৭ মিনিট নাগাদ শৌচালয়ের দরজায় ডাকাডাকি করা হয়। ভিতর থেকে কোনও সাড়া না মেলায় শেষ পর্যন্ত দরজা ভেঙে তাঁকে অচৈতন্য অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। চিকিৎসকেরা তাঁকে বাঁচানোর চেষ্টা করলেও ততক্ষণে মৃত্যু হয়ে যায়।

শৌচালয়ের বাইরে থাকা CCTV ফুটেজ ইতিমধ্যেই পুলিশের তদন্তের আওতায় এসেছে। পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে ফুটেজ সংগ্রহ করেছে এবং পুরো ঘটনাক্রম খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

দেহের পাশে ওষুধের ভায়াল, হাতে ইঞ্জেকশনের দাগ

তদন্তে সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন তৈরি হয়েছে শৌচালয়ের ভিতরে পাওয়া ওষুধ ঘিরে। পুলিশ সূত্রের খবর, সেখানে ফেন্টানিলের তিনটি ভায়াল পাওয়া যায়—একটি ব্যবহৃত এবং দু’টি ভর্তি ছিল। রুপালির বাঁ হাতের কনুইয়ের কাছে ইঞ্জেকশনের দাগও পাওয়া যায়।

এখনও পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল—ওষুধগুলি রুপালি নিজে নিয়ে শৌচালয়ে ঢুকেছিলেন, নাকি সেগুলি আগে থেকেই সেখানে ছিল, তা তদন্তে স্পষ্ট হয়নি।

প্রাথমিক ময়নাতদন্তে কী জানা গেল?

আজকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আপডেট এসেছে প্রাথমিক ময়নাতদন্ত থেকে। সংবাদমাধ্যম সূত্র অনুযায়ী অতিরিক্ত মাত্রায় ওষুধ প্রয়োগের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। প্রাথমিক রিপোর্টে শ্বাসপ্রশ্বাস বন্ধ হয়ে মৃত্যুর কথা উল্লেখ রয়েছে। অক্সিজেনের অভাবে চোখের সাদা অংশ, নখ এবং জিভের একাংশ নীলচে হয়ে যাওয়ার কথাও উঠে এসেছে।

তবে এটিকে এখনও চূড়ান্ত মৃত্যুর কারণ বলা যাচ্ছে না। রক্ত, ফুসফুস-সহ প্রয়োজনীয় নমুনা ফরেন্সিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। সেই রিপোর্ট হাতে আসার পরই ওষুধের ভূমিকা এবং মৃত্যুর প্রকৃত কারণ আরও স্পষ্ট হবে।

আত্মহত্যা, দুর্ঘটনা নাকি অন্য কোনও সম্ভাবনা?

এখনও ঘটনাটিকে আত্মহত্যা বলে নিশ্চিত করেনি পুলিশ। কারণ ঘটনাস্থল থেকে কোনও সুইসাইড নোট পাওয়া যায়নি। আবার শরীরে দৃশ্যমান আঘাতের চিহ্নও মেলেনি। ফলে আত্মহত্যা হয়ে থাকলে কীভাবে ঘটনাটি ঘটল, কিংবা এটি দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু কি না সেই প্রশ্নগুলিও তদন্তকারীদের সামনে রয়েছে।

রুপালির কনুইয়ের কাছে ইঞ্জেকশনের চিহ্ন এবং শৌচালয়ে ওষুধের ভায়াল পাওয়ার বিষয়টিও আলাদাভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

আজ নতুন করে ৮ সদস্যের তদন্ত কমিটি

রুপালির মৃত্যুর তদন্তে পুলিশের পাশাপাশি স্বাস্থ্য দফতরও পৃথক তদন্ত শুরু করেছে। আজ, ১৪ অগস্টের আপডেট অনুযায়ী, আট সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির নেতৃত্বে রয়েছেন ফরেন্সিক মেডিসিনের বিভাগীয় প্রধান।

কমিটি খতিয়ে দেখবে রুপালির মৃত্যুর আগে ও পরে ঠিক কী ঘটেছিল, হাসপাতালের ভিতরে কী পরিস্থিতি ছিল এবং ওষুধগুলি তিনি কোথা থেকে পেলেন। বিশেষভাবে ১২ অগস্ট সন্ধ্যা ৭টা থেকে ১৩ অগস্ট সকাল ৮টা পর্যন্ত গাইনি বিল্ডিংয়ের অ্যান্টিনেটাল ওয়ার্ডের CCTV ফুটেজ পরীক্ষা করা হচ্ছে। আগামী সাত দিনের মধ্যে স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিকর্তার কাছে রিপোর্ট জমা দেওয়ার কথা।

তদন্তে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—ফেন্টানিল বা অন্য ওষুধ নেওয়ার ক্ষেত্রে হাসপাতালের নির্দিষ্ট রেজিস্টার বা নথিভুক্তির নিয়ম মানা হয়েছিল কি না।

পরিবারের বক্তব্য কী?

রুপালির বাড়ি পূর্ব মেদিনীপুরের পটাশপুরে। বর্তমানে তিনি স্বামী রাহুল দাসের সঙ্গে দমদম ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় থাকতেন। স্বামীর সঙ্গে তাঁর শেষ কথা হয়েছিল বুধবার সন্ধ্যা ৭টা ৪৫ মিনিট নাগাদ। রাহুলের বক্তব্য অনুযায়ী, সেই সময় রুপালি স্বাভাবিকভাবেই কথা বলেছিলেন এবং পরে কথা বলবেন জানিয়েছিলেন।

রুপালির বাবা জানিয়েছেন, মেয়ের মৃত্যু কীভাবে হল তা তাঁরা বুঝতে পারছেন না। পরিবারের পক্ষ থেকে ঘটনার সঠিক তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে। এখনও পর্যন্ত পরিবারের তরফে থানায় কোনও অভিযোগ দায়ের করা হয়নি; ময়নাতদন্তের রিপোর্ট দেখে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন স্বামী।

কোথায় দাঁড়িয়ে তদন্ত?

এই মুহূর্তে রুপালি বর্মনের মৃত্যুর ক্ষেত্রে তিনটি বিষয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ— প্রাথমিক ময়নাতদন্ত, ফরেন্সিক রিপোর্ট এবং CCTV ফুটেজ। এর পাশাপাশি হাসপাতাল থেকে ওষুধ কীভাবে বেরোল এবং তার ব্যবহার সংক্রান্ত নিয়ম মানা হয়েছিল কি না, সেটিও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

অর্থাৎ, প্রাথমিক রিপোর্টে অতিরিক্ত ওষুধ প্রয়োগের সম্ভাবনা উঠে এলেও রুপালি আত্মহত্যা করেছেন, দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়েছে, নাকি এর পিছনে অন্য কোনও কারণ রয়েছে আজ পর্যন্ত কোনওটিই নিশ্চিত নয়।চূড়ান্ত ফরেন্সিক রিপোর্ট এবং তদন্ত কমিটির রিপোর্টের দিকেই এখন নজর।