মধ্যবিত্তের মুখে হাসি, নাকি ভবিষ্যতের চিন্তা? বিজেপির প্রথম বাজেট নিয়ে জোর বিতর্ক
বাজেটের সবচেয়ে বড় ঘোষণা হলো ‘অন্নপূর্ণা যোজনা’র জন্য ৩৬,০০০ কোটি টাকা বরাদ্দ। এই প্রকল্পের মাধ্যমে যোগ্য মহিলাদের প্রতি মাসে ৩,০০০ টাকা করে সরাসরি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। রাজ্যের প্রায় ২৮ লক্ষ মহিলা এই প্রকল্পের আওতায় আসতে পারেন বলে সরকারি সূত্রের দাবি।
মধুরিমা সেনগুপ্ত, কলকাতা : পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক পালাবদলের পর ২২ জুন পেশ হলো বিজেপি সরকারের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেট। স্বাভাবিকভাবেই রাজ্যের মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর নজর ছিল এই বাজেটের দিকে। কারণ সংসারের খরচ, চাকরি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, মূল্যবৃদ্ধি এবং সরকারি সুবিধা—সবকিছুর ওপরই বাজেটের সরাসরি প্রভাব পড়ে। নতুন সরকারের এই বাজেটে একদিকে যেমন বেশ কিছু বড় আর্থিক ঘোষণা করা হয়েছে, তেমনি রাজ্যের আর্থিক চাপ এবং ভবিষ্যৎ রাজস্ব বৃদ্ধির প্রশ্নও উঠে এসেছে।
এই বাজেটের সবচেয়ে বড় ঘোষণা হলো ‘অন্নপূর্ণা যোজনা’র জন্য ৩৬,০০০ কোটি টাকা বরাদ্দ। এই প্রকল্পের মাধ্যমে যোগ্য মহিলাদের প্রতি মাসে ৩,০০০ টাকা করে সরাসরি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। রাজ্যের প্রায় ২৮ লক্ষ মহিলা এই প্রকল্পের আওতায় আসতে পারেন বলে সরকারি সূত্রের দাবি। বাজেটের মোট সামাজিক খরচের একটি বড় অংশই এই প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে।
মধ্যবিত্ত পরিবারের আরেকটি বড় প্রত্যাশা ছিল সরকারি কর্মচারীদের মহার্ঘ ভাতা বা ডিএ। বাজেটে সরকারি কর্মচারী এবং পেনশনভোগীদের জন্য ২০ শতাংশ ডিএ বৃদ্ধির ঘোষণা করা হয়েছে। অর্থাৎ মোট ডিএ-এর পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ালো ৩৮%। দীর্ঘদিন ধরে ডিএ নিয়ে আন্দোলন ও আইনি লড়াই চলার পর এই ঘোষণা রাজ্যের লক্ষাধিক কর্মচারী পরিবারের জন্য বড় স্বস্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বাজেটে কর্মসংস্থান এবং শিল্পায়নের ওপরও বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। সরকার জানিয়েছে, আগামী কয়েক বছরে শিল্প বিনিয়োগ আকর্ষণ, নতুন শিল্পনীতি প্রণয়ন এবং পরিকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোর চেষ্টা করা হবে। মধ্যবিত্ত পরিবারের বড় অংশের কাছে চাকরির বাজার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এছাড়াও শিক্ষক নিয়োগে বড় ঘোষণা! ৫০ হাজার শিক্ষক ও শিক্ষা কর্মী নিয়োগ করবে সরকার। ১ লক্ষ শূন্য পদ নিয়োগ করা হবে, এর মধ্যে ৩৩ শতাংশ মহিলাদের নিয়োগ করা হবে।
গ্রামীণ অর্থনীতিকেও এই বাজেটে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কৃষকদের জন্য সেচের খরচ মকুব, ভূমিহীন কৃষকদের জন্য বছরে ৪,০০০ টাকা সহায়তা এবং কৃষি খাতে অতিরিক্ত আর্থিক সুবিধার কথা জানানো হয়েছে। কৃষির সঙ্গে যুক্ত বহু মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য এই সিদ্ধান্ত কিছুটা স্বস্তি এনে দিতে পারে।
সরকারি নথি ও বাজেট ঘোষণায় উত্তরবঙ্গের উন্নয়ন, রাস্তা নির্মাণ, পর্যটন, চা শিল্প এবং বিভিন্ন অবকাঠামো প্রকল্পের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে। যদিও প্রতিটি প্রকল্পের বিস্তারিত বিভাগভিত্তিক বরাদ্দ এখনও সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ্যে আসেনি, তবুও সরকার স্পষ্ট করেছে যে শিল্প, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং বিনিয়োগ বৃদ্ধির মাধ্যমে রাজস্ব আয় বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হবে।
তবে প্রশ্ন উঠছে, এত বড় বড় ঘোষণা বাস্তবায়নের জন্য অর্থ আসবে কোথা থেকে? পশ্চিমবঙ্গের ঋণের বোঝা দীর্ঘদিন ধরেই বড় সমস্যা। নতুন সরকার রাজস্ব বাড়ানো এবং আর্থিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার কথা বলেছে। অর্থাৎ একদিকে কল্যাণমূলক প্রকল্পে বিপুল ব্যয়, অন্যদিকে রাজস্ব বৃদ্ধির লক্ষ্য—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই আগামী দিনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হতে চলেছে।
সব মিলিয়ে এই বাজেটে মধ্যবিত্তের জন্য কিছু স্পষ্ট সুখবর রয়েছে। সরকারি কর্মচারীদের জন্য ২০ শতাংশ ডিএ বৃদ্ধি, মহিলাদের জন্য ৩৬,০০০ কোটি টাকার অন্নপূর্ণা যোজনা, কৃষকদের জন্য আর্থিক সহায়তা এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে। তবে একই সঙ্গে রাজ্যের আর্থিক চাপ, ঋণের বোঝা এবং ভবিষ্যতে রাজস্ব বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা মধ্যবিত্তের সামনে কিছু প্রশ্নও রেখে যাচ্ছে। তাই এই বাজেটকে এককথায় সুখবর বা নতুন চাপ—কোনও একটিতে সীমাবদ্ধ না রেখে বলা যায়, এটি মধ্যবিত্তের জন্য আশা এবং সতর্কতার মিশ্র বার্তা বহন করছে।